০৮:০৬ পূর্বাহ্ন, বুধবার, ১৭ এপ্রিল ২০২৪, ৪ বৈশাখ ১৪৩১ বঙ্গাব্দ

একযোগে কাজের অঙ্গীকার ভারত-সংযুক্ত আরব আমিরাতের

অবশেষে সম্পন্ন হলো ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার ঐতিহিাসিক চুক্তি। ১৮ ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ মুহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনের সময় একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষর করে দেশ দুটো। পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে উভয় রাষ্ট্র।

সম্মেলনের পর একটি যৌথ বিবৃতি জারি করে উভয় পক্ষ, যেখানে মূলত চুক্তির ভিশন বা লক্ষ্য নিয়ে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুসারে উভয় রাষ্ট্র বৈশ্বিক সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এঁকে অন্যের পাশে দাঁড়াবে, একটি শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে একত্রে কাজ করবে!

সম্মেলনে গৃহীত বিস্তৃত রোডম্যাপ অনুসারে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা জোরদার করতে একত্রে কাজ করবে দেশ দুটো। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এবং হাউবারা সংরক্ষণ, শিল্প এবং উন্নত প্রযুক্তি, নিম্ন কার্বন হাইড্রোজেন উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ, খাদ্য নিরাপত্তা, আর্থিক সেবা সহ বেশ কিছু খাতে অংশীদারিত্ব জোরদার করতে স্ট্যাম্পে সই করেছে উভয় পক্ষ।

যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রগুলো নিয়ে নিচে বিস্তৃত উল্লেখ করা হলো:

অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব:

দু দেশের মধ্যকার সম্পৃক্ততার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য অবশ্যই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমৃদ্ধি অর্জন। উভয় দেশের নেতারাই সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্কের সূচনা করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নতুন পথ উন্মুক্ত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

চুক্তি অনুসারে জেবেল আলি ফ্রি জোনে একটি নিবেদিত ইন্ডিয়া মার্ট প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছেন দু দেশের নেতৃবৃন্দ। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি এবং যৌথ উদ্যোগসমূহের জন্য একটি উত্সর্গীকৃত বিনিয়োগ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ ত্বরান্বিত করা সহ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে দ্বিমুখী বিনিয়োগ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। একটি খাদ্য করিডোর স্থাপনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশ দুটো।

দু দেশের শীর্ষ নেতৃত্বই আমিরাতে বিশেষায়িত শিল্প উন্নত প্রযুক্তি অঞ্চল স্থাপনে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে উৎসাহিত করেছেন। কৃষি প্রযুক্তি, ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম সহ লজিস্টিক পরিষেবা, ওষুধ, চিকিৎসা ডিভাইস, কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের স্থানীয় মূল্য চেইনগুলোকে একীভূত করতে সাহায্য করবে চুক্তিটির ফলে।

সাংস্কৃতিক সহযোগিতা:

দু দেশের মধ্যকার গভীর ঐতিহ্য এবং ইতিহাসে দৃঢ় সম্পর্কের স্বীকৃতি হিসেবে চুক্তিটিতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার উল্লেখ রয়েছে। উভয় রাষ্ট্রের সৃজনশীল ও চিন্তাশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান, সাংস্কৃতিক প্রকল্প, প্রদর্শনী এবং কথোপকথনের সুবিধার্থে একটি ভারত-আমিরাত সাংস্কৃতিক পরিষদ গঠন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর তত্ত্বাবধানে করবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক কূটনীতির কার্যালয় এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কাউন্সিল (আইসিসিআর)।

শক্তি অংশীদারিত্ব:

গত ৫০ বছরে ভারত এবং আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের অন্যতম মূল ভিত্তি শক্তি ও জ্বালানী খাত। উভয় রাষ্ট্রই এঁকে অন্যের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি বাণিজ্য অংশীদার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি খাতে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক ব্যাপক জোরদার হয়েছে। কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উভয় দেশই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ উন্নীত করেছে এবং প্রদান করেছে।

ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তি চাহিদা মেটাতে আমিরাতের ভূমিকা ব্যাপক। ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ প্রোগ্রামে অপরিশোধিত তেলের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক অংশীদারও এই সংযুক্ত আমিরশাহী। ভারতীয় কোম্পানিগুলোও সমগ্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের শক্তি সেক্টর জুড়ে নিজেদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে।

ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ শক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য নতুন সহযোগিতা চুক্তিটি দারুণভাবে কাজে আসবে বলে বোদ্ধামহলের ধারণা।

জলবায়ু কর্ম এবং নবায়নযোগ্যতা:

ইতোমধ্যে গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছে, আগামী ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য কোপ-২৮ সম্মেলনের আয়োজক হতে চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে, ভারত প্রথম থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ভীষণ সোচ্চার। তাই জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের অপরিহার্য প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ প্যারিস চুক্তির ভিত্তিতে জ্বালানি স্থানান্তর এবং বাস্তবায়নের সুবিধার্থে জলবায়ু কর্মকে ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার করেছেন নতুন চুক্তিতে। কোপ সম্মেলন, আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সৌর জোটে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে ভারত ও আমিরাত। তাছাড়া, গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের উপর বিশেষ ফোকাস সহ প্রযুক্তির মাপকাঠিতে সাহায্য করার জন্য একটি যৌথ হাইড্রোজেন টাস্ক ফোর্স প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়েছেন উভয় রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ।

প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব:

ডিজিটালাইজেশনের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া বিশ্বে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানব উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে প্রযুক্তিতে সহযোগিতা প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উভয় রাষ্ট্রের স্টার্টআপের দ্রুত সাফল্যকে কাজে লাগাতে অঞ্চলজুড়ে এই প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে কাজের অঙ্গীকার করেছে দু দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব। স্টার্ট-আপ ইন্টারেলিয়া, ফিনটেক, এডুটেক, হেলথ কেয়ার, লজিস্টিকস এবং সাপ্লাই চেইন, এগ্রিটেক, চিপ ডিজাইন এবং গ্রিন এনার্জি এর উপর ফোকাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেতারা।

দক্ষতা সহযোগিতা:

শ্রমশক্তির উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য উচ্চ দক্ষতার মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি চুক্তিতে উল্লেখ করেছে ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের দক্ষ কর্মীবাহিনীর অবদান স্বীকার করে নিয়েছে দেশটি। তাই পারস্পরিক মানসম্মত পেশাদার মান এবং দক্ষতা কাঠামো বিকাশের জন্য উভয় পক্ষ তাদের সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা:

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঐতিহাসিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। মহামারী চলাকালীন সময়েও বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে বোদ্ধমহলের আলোচনায়। তাই খাদ্য সরবরাহ চেইনের স্থিতিস্থাপকতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করা হয়েছে চুক্তিতে। ফলত, কৃষি বাণিজ্য এবং খাদ্য ব্যবস্থায় সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে দেশ দুটো। এ সংক্রান্ত খাতে অবকাঠামো এবং উত্সর্গীকৃত লজিস্টিক পরিষেবা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে দু দেশের নেতারা। এছাড়া, প্রাসঙ্গিক সরকারী সংস্থা এবং শিল্প অংশীদারদের উভয় দেশে শীঘ্রই পাইলট প্রকল্প শুরু ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য সহযোগিতা:

মহামারী করোনা গোটা বিশ্বকে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য সহযোগিতার গুরুত্ব। তাই নতুন চুক্তিতে স্বভাবতই স্থান পেয়েছে স্বাস্থ্য সহযোগিতার বিষয়টি। স্বাস্থ্যখাতে ভ্যাকসিনের নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইন তৈরী, গবেষণা, উৎপাদন ও উন্নয়নে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে দেশ দুটো।

শিক্ষা সহযোগিতা:

দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে উৎসাহিত ও সমর্থন করতে পারবে, এমন বিশ্ব-মানের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে নেতারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি ভারতীয় প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা:

আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে এঁকে অন্যকে সমর্থনের বিষয়টি উঠে এসেছে চুক্তিতে। ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অভিন্নতাকে প্রতিফলিত করে, এমন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত খাতে সহযোগিতা একযোগে কাজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উভয় রাষ্ট্রের নেতৃত্ব। উল্লেখ্য, ভারত বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। অন্যদিকে আগামী ২০২২-২৩ সেশনে সংস্থাটির অস্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আবার, চলতি বছরে জি-২০ ফোরামের সভাপতিত্ব পেয়েছে ভারত। তাই দু দেশের এই শীর্ষ সম্মেলন এবং চুক্তি স্বভাবতই বিশ্বজুড়ে আকর্ষণ কেড়েছে।

প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব:

সমসাময়িক বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক সন্ত্রাস এবং প্রতিরক্ষা ইস্যু। বিশ্বের প্রায় সকল দেশই এই খাতে অঢেল অর্থ ও উদ্বেগ বিনিয়োগ করছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রেখে সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছেন ভারত ও আমিরাতের নেতৃবৃন্দ। প্রতিরক্ষা বিনিময়, অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দু দেশ।

বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করে নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখা ও শক্তিশালী করার গুরুত্বের কথা স্মরণ করেন যৌথ বিবৃতিতে। অঞ্চলজুড়ে সমন্বিত, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরীতে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করার অঙ্গীকার করেছে ভারত ও আমিরাত।

পাশাপাশি জাতিসংঘ রেজুলেশন মোতাবেক সন্ত্রাসবাদ দমন এবং নিরাপত্তা পরিষদের প্রাসঙ্গিক রেজুলেশন অনুসারে এঁকে অন্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে নিজেদের পূর্ব অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশ দুটো।

ফলত, দু দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া চুক্তি এবং পরবর্তীতে প্রদত্ত যৌথ বিবৃতি অনুসারে বুঝা যাচ্ছে সম্পর্ক উন্নয়নের এক নতুন ধাপে প্রবেশ করতে চলেছে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। খবর: ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক

ট্যাগ:

একযোগে কাজের অঙ্গীকার ভারত-সংযুক্ত আরব আমিরাতের

প্রকাশ: ০৪:৩৭:৩৮ পূর্বাহ্ন, শনিবার, ১৯ ফেব্রুয়ারী ২০২২

অবশেষে সম্পন্ন হলো ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের মধ্যকার ঐতিহিাসিক চুক্তি। ১৮ ফেব্রুয়ারী, শুক্রবার, ভারতের প্রধানমন্ত্রী নরেন্দ্র মোদী এবং আবুধাবির ক্রাউন প্রিন্স শেখ মুহম্মদ বিন জায়েদ আল নাহিয়ানের ভার্চুয়াল শীর্ষ সম্মেলনের সময় একটি ব্যাপক অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি (সিইপিএ) স্বাক্ষর করে দেশ দুটো। পারস্পরিক সমৃদ্ধি অর্জনে এবং দ্বিপাক্ষিক সম্পর্ক মজবুত করতে একটি বিস্তৃত রোডম্যাপ প্রণয়ন করেছে উভয় রাষ্ট্র।

সম্মেলনের পর একটি যৌথ বিবৃতি জারি করে উভয় পক্ষ, যেখানে মূলত চুক্তির ভিশন বা লক্ষ্য নিয়ে বিবৃতি দেয়া হয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, চুক্তি অনুসারে উভয় রাষ্ট্র বৈশ্বিক সকল চ্যালেঞ্জ মোকাবেলায় এঁকে অন্যের পাশে দাঁড়াবে, একটি শক্তিশালী ও স্থিতিস্থাপক সম্পর্ক গড়ে তুলতে আরও ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করবে এবং নির্দিষ্ট লক্ষ্য অর্জনে একত্রে কাজ করবে!

সম্মেলনে গৃহীত বিস্তৃত রোডম্যাপ অনুসারে, বাণিজ্য, বিনিয়োগ, উদ্ভাবন এবং বিভিন্ন ক্ষেত্রে দ্বিপাক্ষিক সম্পৃক্ততা জোরদার করতে একত্রে কাজ করবে দেশ দুটো। পাশাপাশি জলবায়ু পরিবর্তন এবং হাউবারা সংরক্ষণ, শিল্প এবং উন্নত প্রযুক্তি, নিম্ন কার্বন হাইড্রোজেন উন্নয়ন এবং বিনিয়োগ, খাদ্য নিরাপত্তা, আর্থিক সেবা সহ বেশ কিছু খাতে অংশীদারিত্ব জোরদার করতে স্ট্যাম্পে সই করেছে উভয় পক্ষ।

যৌথ বিবৃতিতে উল্লেখ করা দ্বিপাক্ষিক সম্পর্কের ক্ষেত্রগুলো নিয়ে নিচে বিস্তৃত উল্লেখ করা হলো:

অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব:

দু দেশের মধ্যকার সম্পৃক্ততার সবচেয়ে বড় লক্ষ্য অবশ্যই অর্থনৈতিক অংশীদারিত্বের ভিত্তিতে সমৃদ্ধি অর্জন। উভয় দেশের নেতারাই সমন্বিত অর্থনৈতিক অংশীদারিত্ব চুক্তি স্বাক্ষরকে স্বাগত জানিয়েছেন এবং চুক্তিটি দুই দেশের মধ্যে শক্তিশালী অর্থনৈতিক সম্পর্কের সূচনা করবে এবং বাণিজ্য ও বিনিয়োগের জন্য নতুন পথ উন্মুক্ত করবে বলে আশাবাদ ব্যক্ত করেছেন।

চুক্তি অনুসারে জেবেল আলি ফ্রি জোনে একটি নিবেদিত ইন্ডিয়া মার্ট প্রতিষ্ঠাকে স্বাগত জানিয়েছেন দু দেশের নেতৃবৃন্দ। অন্যদিকে, সংযুক্ত আরব আমিরাতের কোম্পানি এবং যৌথ উদ্যোগসমূহের জন্য একটি উত্সর্গীকৃত বিনিয়োগ অঞ্চল প্রতিষ্ঠার কাজ ত্বরান্বিত করা সহ অবকাঠামো প্রকল্পগুলোতে দ্বিমুখী বিনিয়োগ জোরদার করার কথা বলা হয়েছে। একটি খাদ্য করিডোর স্থাপনের বিষয়েও সিদ্ধান্ত নিয়েছে দেশ দুটো।

দু দেশের শীর্ষ নেতৃত্বই আমিরাতে বিশেষায়িত শিল্প উন্নত প্রযুক্তি অঞ্চল স্থাপনে ভারতীয় বিনিয়োগকারীদের জন্য বিনিয়োগের সুযোগ তৈরি করতে উৎসাহিত করেছেন। কৃষি প্রযুক্তি, ইস্পাত এবং অ্যালুমিনিয়াম সহ লজিস্টিক পরিষেবা, ওষুধ, চিকিৎসা ডিভাইস, কৃষি ক্ষেত্রে বিদ্যমান এবং ভবিষ্যতের বিশেষায়িত অর্থনৈতিক অঞ্চলসমূহের স্থানীয় মূল্য চেইনগুলোকে একীভূত করতে সাহায্য করবে চুক্তিটির ফলে।

সাংস্কৃতিক সহযোগিতা:

দু দেশের মধ্যকার গভীর ঐতিহ্য এবং ইতিহাসে দৃঢ় সম্পর্কের স্বীকৃতি হিসেবে চুক্তিটিতে সাংস্কৃতিক সহযোগিতার উল্লেখ রয়েছে। উভয় রাষ্ট্রের সৃজনশীল ও চিন্তাশীল জনগোষ্ঠীর মধ্যে পারস্পরিক আদান-প্রদান, সাংস্কৃতিক প্রকল্প, প্রদর্শনী এবং কথোপকথনের সুবিধার্থে একটি ভারত-আমিরাত সাংস্কৃতিক পরিষদ গঠন করা হবে বলে সিদ্ধান্ত নেয়া হয়েছে। এর তত্ত্বাবধানে করবে সংযুক্ত আরব আমিরাতের পররাষ্ট্র ও আন্তর্জাতিক সহযোগিতা মন্ত্রণালয়ের সাংস্কৃতিক কূটনীতির কার্যালয় এবং ভারতীয় সাংস্কৃতিক সম্পর্ক কাউন্সিল (আইসিসিআর)।

শক্তি অংশীদারিত্ব:

গত ৫০ বছরে ভারত এবং আমিরাতের মধ্যে সম্পর্কের অন্যতম মূল ভিত্তি শক্তি ও জ্বালানী খাত। উভয় রাষ্ট্রই এঁকে অন্যের গুরুত্বপূর্ণ শক্তি বাণিজ্য অংশীদার। বিশেষ করে সাম্প্রতিক বছরগুলোতে জ্বালানি খাতে দুই দেশের মধ্যে কৌশলগত সম্পর্ক ব্যাপক জোরদার হয়েছে। কৌশলগত অংশীদারিত্বের মাধ্যমে উভয় দেশই উল্লেখযোগ্য বিনিয়োগের সুযোগ উন্নীত করেছে এবং প্রদান করেছে।

ভারতের ক্রমবর্ধমান শক্তি চাহিদা মেটাতে আমিরাতের ভূমিকা ব্যাপক। ভারতের কৌশলগত পেট্রোলিয়াম রিজার্ভ প্রোগ্রামে অপরিশোধিত তেলের মাধ্যমে বিনিয়োগ করার জন্য প্রথম আন্তর্জাতিক অংশীদারও এই সংযুক্ত আমিরশাহী। ভারতীয় কোম্পানিগুলোও সমগ্র সংযুক্ত আরব আমিরাতের শক্তি সেক্টর জুড়ে নিজেদের অংশগ্রহণ ক্রমাগত বৃদ্ধি করছে।

ভারতের ক্রমবর্ধমান অর্থনীতিতে সাশ্রয়ী ও নিরাপদ শক্তি সরবরাহের ব্যবস্থা নিশ্চিত করার জন্য নতুন সহযোগিতা চুক্তিটি দারুণভাবে কাজে আসবে বলে বোদ্ধামহলের ধারণা।

জলবায়ু কর্ম এবং নবায়নযোগ্যতা:

ইতোমধ্যে গোটা বিশ্ব জেনে গিয়েছে, আগামী ২০২৩ সালে অনুষ্ঠিতব্য কোপ-২৮ সম্মেলনের আয়োজক হতে চলেছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। অন্যদিকে, ভারত প্রথম থেকেই জলবায়ু পরিবর্তন ইস্যুতে ভীষণ সোচ্চার। তাই জলবায়ু সংক্রান্ত পদক্ষেপের অপরিহার্য প্রয়োজনকে স্বীকৃতি দিয়ে উভয় রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ প্যারিস চুক্তির ভিত্তিতে জ্বালানি স্থানান্তর এবং বাস্তবায়নের সুবিধার্থে জলবায়ু কর্মকে ত্বরান্বিত করার অঙ্গীকার করেছেন নতুন চুক্তিতে। কোপ সম্মেলন, আন্তর্জাতিক নবায়নযোগ্য শক্তি সংস্থা এবং আন্তর্জাতিক সৌর জোটে ঘনিষ্ঠভাবে কাজ করতে সম্মত হয়েছে ভারত ও আমিরাত। তাছাড়া, গ্রিন হাইড্রোজেন উৎপাদনের উপর বিশেষ ফোকাস সহ প্রযুক্তির মাপকাঠিতে সাহায্য করার জন্য একটি যৌথ হাইড্রোজেন টাস্ক ফোর্স প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হয়েছেন উভয় রাষ্ট্রের নেতৃবৃন্দ।

প্রযুক্তি অংশীদারিত্ব:

ডিজিটালাইজেশনের দিকে দ্রুত ধাবিত হওয়া বিশ্বে দ্বিপাক্ষিক অর্থনৈতিক প্রবৃদ্ধি এবং মানব উন্নয়নকে ত্বরান্বিত করার উদ্দেশ্যে প্রযুক্তিতে সহযোগিতা প্রসারিত করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। সাম্প্রতিক বছরগুলোতে উভয় রাষ্ট্রের স্টার্টআপের দ্রুত সাফল্যকে কাজে লাগাতে অঞ্চলজুড়ে এই প্ল্যাটফর্মের বিস্তারে কাজের অঙ্গীকার করেছে দু দেশের শীর্ষ নেতৃত্ব। স্টার্ট-আপ ইন্টারেলিয়া, ফিনটেক, এডুটেক, হেলথ কেয়ার, লজিস্টিকস এবং সাপ্লাই চেইন, এগ্রিটেক, চিপ ডিজাইন এবং গ্রিন এনার্জি এর উপর ফোকাস করার সিদ্ধান্ত নিয়েছে নেতারা।

দক্ষতা সহযোগিতা:

শ্রমশক্তির উত্পাদনশীলতা বাড়ানোর জন্য উচ্চ দক্ষতার মূল্যকে স্বীকৃতি দেয়ার বিষয়টি চুক্তিতে উল্লেখ করেছে ভারত এবং সংযুক্ত আরব আমিরাত। পাশাপাশি সংযুক্ত আরব আমিরাতের বিভিন্ন অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে ভারতের দক্ষ কর্মীবাহিনীর অবদান স্বীকার করে নিয়েছে দেশটি। তাই পারস্পরিক মানসম্মত পেশাদার মান এবং দক্ষতা কাঠামো বিকাশের জন্য উভয় পক্ষ তাদের সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছে।

খাদ্য নিরাপত্তা:

খাদ্য নিরাপত্তার ক্ষেত্রে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাতের ঐতিহাসিক কৌশলগত অংশীদারিত্ব রয়েছে। মহামারী চলাকালীন সময়েও বিষয়টি বারবার সামনে এসেছে বোদ্ধমহলের আলোচনায়। তাই খাদ্য সরবরাহ চেইনের স্থিতিস্থাপকতা ও নির্ভরযোগ্যতা বাড়ানোর প্রয়োজনীয়তার কথা স্বীকার করা হয়েছে চুক্তিতে। ফলত, কৃষি বাণিজ্য এবং খাদ্য ব্যবস্থায় সম্পর্ক বাড়ানোর বিষয়ে অঙ্গীকার করেছে দেশ দুটো। এ সংক্রান্ত খাতে অবকাঠামো এবং উত্সর্গীকৃত লজিস্টিক পরিষেবা বাড়ানোর বিষয়ে সম্মত হয়েছে দু দেশের নেতারা। এছাড়া, প্রাসঙ্গিক সরকারী সংস্থা এবং শিল্প অংশীদারদের উভয় দেশে শীঘ্রই পাইলট প্রকল্প শুরু ও বাস্তবায়নের নির্দেশনা দেয়া হয়েছে।

স্বাস্থ্য সহযোগিতা:

মহামারী করোনা গোটা বিশ্বকে চোখে আঙুল তুলে দেখিয়ে দিয়েছে স্বাস্থ্য সহযোগিতার গুরুত্ব। তাই নতুন চুক্তিতে স্বভাবতই স্থান পেয়েছে স্বাস্থ্য সহযোগিতার বিষয়টি। স্বাস্থ্যখাতে ভ্যাকসিনের নির্ভরযোগ্য সাপ্লাই চেইন তৈরী, গবেষণা, উৎপাদন ও উন্নয়নে সহযোগিতা করতে সম্মত হয়েছে দেশ দুটো।

শিক্ষা সহযোগিতা:

দুই দেশের মধ্যকার বিদ্যমান ঐতিহাসিক সম্পর্কের বিষয়টি নিশ্চিত করে উদ্ভাবন ও প্রযুক্তিগত অগ্রগতিকে উৎসাহিত ও সমর্থন করতে পারবে, এমন বিশ্ব-মানের প্রতিষ্ঠান প্রতিষ্ঠার প্রয়োজনীয়তা উপলব্ধি করে নেতারা সংযুক্ত আরব আমিরাতে একটি ভারতীয় প্রযুক্তি ইনস্টিটিউট প্রতিষ্ঠা করতে সম্মত হন।

আন্তর্জাতিক ক্ষেত্রে সহযোগিতা:

আঞ্চলিক ও বহুপাক্ষিক ফোরামগুলোতে এঁকে অন্যকে সমর্থনের বিষয়টি উঠে এসেছে চুক্তিতে। ক্রমবর্ধমান কৌশলগত অভিন্নতাকে প্রতিফলিত করে, এমন অর্থনৈতিক ও অবকাঠামোগত খাতে সহযোগিতা একযোগে কাজের সিদ্ধান্ত নিয়েছে উভয় রাষ্ট্রের নেতৃত্ব। উল্লেখ্য, ভারত বর্তমানে নিরাপত্তা পরিষদে অস্থায়ী সদস্য হিসেবে দায়িত্ব পালন করছে। অন্যদিকে আগামী ২০২২-২৩ সেশনে সংস্থাটির অস্থায়ী সদস্যপদ পেয়েছে সংযুক্ত আরব আমিরাত। আবার, চলতি বছরে জি-২০ ফোরামের সভাপতিত্ব পেয়েছে ভারত। তাই দু দেশের এই শীর্ষ সম্মেলন এবং চুক্তি স্বভাবতই বিশ্বজুড়ে আকর্ষণ কেড়েছে।

প্রতিরক্ষা এবং নিরাপত্তা অংশীদারিত্ব:

সমসাময়িক বছরগুলোতে সবচেয়ে বড় উদ্বেগের বিষয় হয়ে দাঁড়িয়েছে বৈশ্বিক সন্ত্রাস এবং প্রতিরক্ষা ইস্যু। বিশ্বের প্রায় সকল দেশই এই খাতে অঢেল অর্থ ও উদ্বেগ বিনিয়োগ করছে। এমতাবস্থায় এই অঞ্চলে শান্তি ও নিরাপত্তা রক্ষায় অবদান রেখে সামুদ্রিক সহযোগিতা বাড়াতে সম্মত হয়েছেন ভারত ও আমিরাতের নেতৃবৃন্দ। প্রতিরক্ষা বিনিময়, অভিজ্ঞতা বিনিময়, প্রশিক্ষণ এবং সক্ষমতা বৃদ্ধি অব্যাহত রাখার মাধ্যমে সম্পর্ক এগিয়ে নিতে সম্মত হয়েছে দু দেশ।

বিভিন্ন আঞ্চলিক ইস্যু নিয়ে আলোচনা করে নেতারা মধ্যপ্রাচ্যে শান্তি বজায় রাখা ও শক্তিশালী করার গুরুত্বের কথা স্মরণ করেন যৌথ বিবৃতিতে। অঞ্চলজুড়ে সমন্বিত, স্থিতিশীল এবং সমৃদ্ধ পরিবেশ তৈরীতে আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান খুঁজতে সহায়তা করার অঙ্গীকার করেছে ভারত ও আমিরাত।

পাশাপাশি জাতিসংঘ রেজুলেশন মোতাবেক সন্ত্রাসবাদ দমন এবং নিরাপত্তা পরিষদের প্রাসঙ্গিক রেজুলেশন অনুসারে এঁকে অন্যের সার্বভৌমত্ব রক্ষার ক্ষেত্রে নিজেদের পূর্ব অঙ্গীকার পুনর্ব্যক্ত করেছে দেশ দুটো।

ফলত, দু দেশের মধ্যে অনুষ্ঠিত হওয়া চুক্তি এবং পরবর্তীতে প্রদত্ত যৌথ বিবৃতি অনুসারে বুঝা যাচ্ছে সম্পর্ক উন্নয়নের এক নতুন ধাপে প্রবেশ করতে চলেছে ভারত ও সংযুক্ত আরব আমিরাত। খবর: ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক