০২:০৫ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

ভারতের বহুপাক্ষিকতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা বহুলাংশে পশ্চিমী জোট দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকলেও এটি ভারতকে নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলার জন্য বিবিধ পারস্পরিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধা দেয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনতা লাভের আগেও, তার আলোচনাকারীরা পদ্ধতি মাফিক কাজ করেছিলেন যাতে কোনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংস্থা উঠে এলে তা যেন ভারতের স্বার্থ (এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের উদ্বেগের কথা) খেয়াল রাখে।

ভারত ছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের (ইউ এন) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তিতে (জি এ টি টি) একটি মূল স্বাক্ষরকারী দেশ। প্রক্রিয়াটির সকল নিয়ম তাদের পক্ষে না গেলেও — ভারত কখনওই রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ছিল না বা জি এ টি টি-তে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অনানুষ্ঠানিক ‘কোয়াড’ জোটের সদস্যও ছিল না — বহুপাক্ষিকতার জন্য ভারতের আগ্রহে কখনওই ভাটা পড়েনি।

পরবর্তী ৭০ বছর ধরে, কখনও জোটভুক্ত হয়ে এবং কখনও একা, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটি অভ্যন্তরীণ ভাবে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের চেষ্টা করেছে। এর ফলে বিশেষত পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালানোর সময়ে ভারত একটি ‘কঠোর’ আলোচক দেশ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ভারতের নিরবচ্ছিন্ন সক্রিয়তা কিছুটা হলেও সমগ্র ব্যবস্থার সংশোধন ঘটাতে সফল হয়েছে (যেমন ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ব্রাজিল এবং ভারতকে কোয়াডের অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে)।

এবং বিনিময়ে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাটিও ভারতের উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে: নতুন শতাব্দীর শুরু থেকেই ভারতের নাটকীয় উত্থান — যা বহুলাংশে দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারের পরিণাম — মুক্ত বাজার এবং বড় যুদ্ধের অনুপস্থিতিতে তার জন্য একাধিক বৃদ্ধি এবং উন্নয়নের সুযোগের সদ্ব্যবহারকে সহজতর করে তুলেছে।

বর্তমানে বহুপাক্ষিকতা এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। এই সঙ্কটের একাধিক উৎস রয়েছে। এটি দেশগুলির মধ্যে বহুপাক্ষিকতার মূল্য এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোতে আলোচনায় অচলাবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অস্ত্রায়নের পরস্পর নির্ভরশীলতা’ — অর্থাৎ কিছু শক্তিশালী দেশের বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের ঘন সন্নিবিষ্ট উৎপাদন সমন্বয়ব্যবস্থায় অবস্থিত কেন্দ্রগুলিকে ক্ষমতার জোরে শোষণ করা — এবং এটি স্পষ্ট যে, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলি আজকের দিনের প্রতিবন্ধকতাগুলির সম্মুখীন হওয়ার উপযুক্ত নয়।

বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাগুলি অতিমারির ফলে প্রকাশ্যে এসেছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ অতিমারি অব্যবস্থাপনার জন্য অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে; এমনকি এখনও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অসহায় ভাবে তার সদস্য দেশগুলির দিকে চেয়ে রয়েছে যখন তারা পরস্পরের মধ্যে টি আর আই পি এস (ট্রিপস) মকুব করা নিয়ে কলহ চালিয়ে যাচ্ছে এবং গ্লোবাল সাউথে টিকাকরণ ও ওষুধ উৎপাদনের সম্ভাব্য ক্ষমতা সর্বোচ্চ ভাবে কাজে লাগাতে পারছে না।

ব্যবস্থাটি একটি চরম সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের এটিকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার পতন ভারত-সহ সব পক্ষকেই ধাক্কা দেবে। দুশ্চিন্তা ও সাবধানতা অবলম্বনের অত্যধিকতায় আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, বহুপাক্ষিকতার সঙ্কট ভারতের কাছে প্রণিধানযোগ্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।

সঙ্কটটি থেকে সরাসরি উদ্ভূত সুযোগগুলি প্রায় চারগুণ। প্রথমত, ভারত নিজে কয়েক দশক ধরে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য জোর দিলেও (যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিতে বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য) ব্যবস্থার সঙ্কট অবশেষে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার জন্য ব্যাপক স্বীকৃতি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদাররা, বিশেষত ইউরোপ তাদের নতুন বন্ধু এবং মিত্রশক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছে।

কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা এই ব্যবস্থা তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং ব্যবস্থা সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয়ত, বহুপাক্ষিকতাবাদের টানাপড়েনের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল গ্লোবাল নর্থ এবং গ্লোবাল সাউথ উভয় তরফেই একাধিক অংশীদার দেশের মোহভঙ্গ, যারা বিশ্বায়নের লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করছে। ফলস্বরূপ, এই মোহভঙ্গ প্রকৃত পক্ষে শুধু মাত্র একাধিক সমাজে ছড়িয়ে পড়া ক্রমবর্ধমান অসাম্যের কারণে ঘটেনি। এর নেপথ্যে রয়েছে বিশ্বায়ন এবং তাকে সহজতর করে এমন বহুপাক্ষিক নিয়ম সম্পর্কে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার অনুপস্থিতি।

উন্নত দেশগুলির বেশ কয়েকটি মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বৃত্তে এটি যথেষ্ট আত্মানুসন্ধানের প্ররোচনা দিয়েছে। যেমন ২০২০ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন এবং তার ‘পশ্চিমহীনতা’র উপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে এটি প্রকাশ পায়। এবং চতুর্থত, যে বিষয়টি ক্রমাগত স্বীকৃতি পাচ্ছে যে কখনও কখনও তড়িঘড়ি বিশ্বায়ন — এমন এক বিশ্বে যেখানে উৎপাদন শৃঙ্খলগুলির অস্ত্রায়ন সম্ভব — আর কোনও মতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্বায়নের বিকল্প এবং আরও স্থিতিশীল পন্থাগুলিকে উন্নত করে তুলতে হবে যাতে সেগুলি সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা উভয়ের লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ করতে পারে। নতুন চিন্তাভাবনা ভাগ করে নেওয়ার জন্য এ এক আদর্শ সময় এবং যদিও ভারতের বরাবরই বিশ্বকে দেওয়ার মতো অনেক কিছুই ছিল, এত দিন পরে বিশ্বও সেটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

এই সুযোগগুলির সদ্ব্যবহার করার জন্য নিম্নলিখিত কৌশলগুলি ভারত অবলম্বন করলে সুফল পাবে। প্রথমত, ভারত ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একাধিক উদ্ভাবনী কৌশলের কথা বললেও সেগুলি কার্যকর করা তার একার পক্ষে সম্ভব হবে না। সমমনস্ক শক্তিগুলির সঙ্গে জোট তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে ভারত জার্মানি ও ফ্রান্সের উদ্যোগে স্থাপিত বহুপাক্ষিকতার জোটটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে জোটটির এবং সর্বোপরি সামগ্রিক সংস্কার কর্মসূচির রূপ দিতে পারে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করার মাধ্যমে ভারত নিজের স্বরকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে।

দ্বিতীয়ত বিশ্বের সাম্প্রতিক অবস্থার দিকে নজর রাখলেও ভারতকে তার নিজের সংলগ্ন অঞ্চলের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। আঞ্চলিক বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রকল্পই চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বি আর আই)। ভারত একটি অনিশ্চিত ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে, যেখানে এক দিকে সে তথাকথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ দ্বারা বেষ্টিত এবং অন্য দিকে অস্ত্রায়নক্ষম আত্মনির্ভরতার বিশ্বে সম্ভাব্য দুর্বল।

বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপানের মতো প্রধান দেশগুলির চিনের ব্যাপক বহুমুখী বিস্তার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার ফলে ভারতের সামনেও উদীয়মান চীনা প্রভাব থেকে বাঁচার একটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। নিরাপত্তা বলয় তৈরি, ভারসাম্য রক্ষা এবং ইউরোপ-সহ অন্যান্য দেশ—যারা একই রকম দ্বিধার সম্মুখীন, তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভারত বহুপাক্ষিকতাবাদের একটি রূপকার হিসেবে নিজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান তৈরি করতে পারে, যে বহুপাক্ষিকতা একটি উদারনৈতিক ব্যবস্থাকেই তুলে ধরে।

তৃতীয়ত, বর্তমানে ভারত মতাদর্শের তুলনায় বাস্তববাদের উপর বেশি জোর দিলেও এমন কিছু মৌলিক মূল্যবোধকেও সে কাজে লাগাতে পারে যা তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী: যেমন গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, আইনের শাসন এবং বাক স্বাধীনতা। মূল্যবোধ এই জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বহুপাক্ষিকতা শুধু মাত্র একটি উপায় নয়, তা নিজে কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে একটি লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে না। বরং প্রশ্ন ওঠা জরুরি: বহুপাক্ষিকতা কীসের জন্য? একটি বহুপাক্ষিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে তর্ক করা কখনই যথেষ্ট নয়। বরং সর্বদা আইনের নেপথ্যে থাকা মূল্যবোধকে আলোচনা করা উচিত। মূল্যবোধের প্রতি এই মনোযোগ চিনের উত্থানের প্রেক্ষিতে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বোপরি পূর্বোক্ত কৌশলগুলোর কোনওটিই কাজে লাগবে না, যদি ভারত অভ্যন্তরীণ ভাবে তার নিজের স্থিতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সরকার যদি জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি এবং উন্নততর জীবনযাত্রার সুযোগ প্রদানে ব্যর্থ হয়, তা হলে দেশের জনগণ আন্তর্জাতিক স্তরে তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে মান্যতা দেবে না। বিশ্বব্যাপী সব সরকারের জন্যই অতিমারি একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা।

ভারতের ক্ষেত্রেও একটি বিপদ আছে। অতিমারির প্রতিক্রিয়ায়, এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মূল্য দিতে গিয়ে, ভারত তার ‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান’ নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে না ঝুঁকে পড়ে। যদি এই ‘আত্মনির্ভরতা’ কে পূর্ববর্তী দশকগুলোর ‘স্বনির্ভরতা’র অনুরূপ হতে দেখা যায়, তা হলে ভারত তার গত ৩০ বছরের কষ্টার্জিত লাভগুলোকে হারাবে। করোনাভাইরাস অতিমারি যখন ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করছে, তখন সঠিক অর্থনৈতিক কৌশল বেছে নেওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই কৌশলগুলোর এক দিকে সরবরাহ শৃঙ্খলগুলোকে নাতিদীর্ঘ করা যা বর্তমান কর্মসূচির লক্ষ্য এবং অন্য দিকে বিশ্বস্ত জোটগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সংহতির সংরক্ষণ এবং সুদৃঢ়করণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

আগ্রাসী বিশ্বায়ন এবং বাজার বন্ধ করে দেওয়ার মাঝে ভারতকে তার ‘সুবর্ণ মাধ্যম’ (সোনালি পথ) খুঁজে বার করতে হবে, যা সমমনস্ক দেশগুলির ক্ষুদ্র জোটের কৌশলগত অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে৷ আন্তর্জাতিক ভাবেও ভারত একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল লাভ করছে সেই সব দেশের সহযোগিতায় যারা এর গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, উদারতাবাদ এবং আরও অনেক মূল্যবোধ ভাগ করে নেয়। এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ধীর বৃদ্ধির গতিতে আটকে থাকা ভারতের সামনে দর কষাকষি ও প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। যাই হোক, একটি শক্তিশালী ও সংস্কারকৃত বহুপাক্ষিকতাকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী দেশগুলির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী শিকড় থাকা বাঞ্ছনীয়। খবর: ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক

ট্যাগ:
জনপ্রিয়

ভারতের বহুপাক্ষিকতা ও কৌশলগত স্বায়ত্তশাসন

প্রকাশ: ০৬:৩৫:৩৭ অপরাহ্ন, বুধবার, ৮ ফেব্রুয়ারী ২০২৩

দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধ পরবর্তী বহুপাক্ষিক ব্যবস্থা বহুলাংশে পশ্চিমী জোট দ্বারা নির্ধারিত হয়ে থাকলেও এটি ভারতকে নতুন আন্তর্জাতিক সংস্থা গড়ে তোলার জন্য বিবিধ পারস্পরিক আলোচনায় সক্রিয় ভূমিকা নিতে বাধা দেয়নি। উদাহরণস্বরূপ বলা যায়, ১৯৪৭ সালে দেশ স্বাধীনতা লাভের আগেও, তার আলোচনাকারীরা পদ্ধতি মাফিক কাজ করেছিলেন যাতে কোনও আন্তর্জাতিক বাণিজ্যিক সংস্থা উঠে এলে তা যেন ভারতের স্বার্থ (এবং অন্যান্য উন্নয়নশীল দেশের উদ্বেগের কথা) খেয়াল রাখে।

ভারত ছিল রাষ্ট্রপুঞ্জের (ইউ এন) প্রতিষ্ঠাতা সদস্য এবং শুল্ক ও বাণিজ্য সংক্রান্ত সাধারণ চুক্তিতে (জি এ টি টি) একটি মূল স্বাক্ষরকারী দেশ। প্রক্রিয়াটির সকল নিয়ম তাদের পক্ষে না গেলেও — ভারত কখনওই রাষ্ট্রপুঞ্জের নিরাপত্তা পরিষদের স্থায়ী সদস্য ছিল না বা জি এ টি টি-তে সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী অনানুষ্ঠানিক ‘কোয়াড’ জোটের সদস্যও ছিল না — বহুপাক্ষিকতার জন্য ভারতের আগ্রহে কখনওই ভাটা পড়েনি।

পরবর্তী ৭০ বছর ধরে, কখনও জোটভুক্ত হয়ে এবং কখনও একা, বিশ্বের বৃহত্তম গণতান্ত্রিক দেশটি অভ্যন্তরীণ ভাবে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের চেষ্টা করেছে। এর ফলে বিশেষত পশ্চিমী দেশগুলির সঙ্গে আলাপ-আলোচনা চালানোর সময়ে ভারত একটি ‘কঠোর’ আলোচক দেশ হিসেবে খ্যাতি অর্জন করেছে। ভারতের নিরবচ্ছিন্ন সক্রিয়তা কিছুটা হলেও সমগ্র ব্যবস্থার সংশোধন ঘটাতে সফল হয়েছে (যেমন ২০০০ সালের মাঝামাঝি সময় থেকে বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা ব্রাজিল এবং ভারতকে কোয়াডের অন্তর্ভুক্ত করতে শুরু করে)।

এবং বিনিময়ে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থাটিও ভারতের উন্নতি ঘটাতে সাহায্য করে: নতুন শতাব্দীর শুরু থেকেই ভারতের নাটকীয় উত্থান — যা বহুলাংশে দেশের অর্থনৈতিক এবং সামাজিক সংস্কারের পরিণাম — মুক্ত বাজার এবং বড় যুদ্ধের অনুপস্থিতিতে তার জন্য একাধিক বৃদ্ধি এবং উন্নয়নের সুযোগের সদ্ব্যবহারকে সহজতর করে তুলেছে।

বর্তমানে বহুপাক্ষিকতা এক অভূতপূর্ব সংকটের মুখোমুখি। এই সঙ্কটের একাধিক উৎস রয়েছে। এটি দেশগুলির মধ্যে বহুপাক্ষিকতার মূল্য এবং বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলোতে আলোচনায় অচলাবস্থার একটি মৌলিক প্রশ্ন তুলে ধরে। এর সঙ্গে যুক্ত হয়েছে ‘অস্ত্রায়নের পরস্পর নির্ভরশীলতা’ — অর্থাৎ কিছু শক্তিশালী দেশের বিশ্বব্যাপী সরবরাহ শৃঙ্খলের ঘন সন্নিবিষ্ট উৎপাদন সমন্বয়ব্যবস্থায় অবস্থিত কেন্দ্রগুলিকে ক্ষমতার জোরে শোষণ করা — এবং এটি স্পষ্ট যে, বহুপাক্ষিক সংস্থাগুলি আজকের দিনের প্রতিবন্ধকতাগুলির সম্মুখীন হওয়ার উপযুক্ত নয়।

বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার দীর্ঘমেয়াদি দুর্বলতাগুলি অতিমারির ফলে প্রকাশ্যে এসেছে: বিশ্ব স্বাস্থ্য সংস্থা কোভিড-১৯ অতিমারি অব্যবস্থাপনার জন্য অনেক সমালোচনার মুখে পড়েছে; এমনকি এখনও বিশ্ব বাণিজ্য সংস্থা অসহায় ভাবে তার সদস্য দেশগুলির দিকে চেয়ে রয়েছে যখন তারা পরস্পরের মধ্যে টি আর আই পি এস (ট্রিপস) মকুব করা নিয়ে কলহ চালিয়ে যাচ্ছে এবং গ্লোবাল সাউথে টিকাকরণ ও ওষুধ উৎপাদনের সম্ভাব্য ক্ষমতা সর্বোচ্চ ভাবে কাজে লাগাতে পারছে না।

ব্যবস্থাটি একটি চরম সঙ্কটের মধ্যে রয়েছে এমন এক সময়ে যখন বিশ্বের এটিকে সবচেয়ে বেশি প্রয়োজন। এই ব্যবস্থার পতন ভারত-সহ সব পক্ষকেই ধাক্কা দেবে। দুশ্চিন্তা ও সাবধানতা অবলম্বনের অত্যধিকতায় আমরা ভুলে যাচ্ছি যে, বহুপাক্ষিকতার সঙ্কট ভারতের কাছে প্রণিধানযোগ্য নতুন সুযোগের দরজা খুলে দিতে পারে।

সঙ্কটটি থেকে সরাসরি উদ্ভূত সুযোগগুলি প্রায় চারগুণ। প্রথমত, ভারত নিজে কয়েক দশক ধরে বহুপাক্ষিক ব্যবস্থার সংস্কারের জন্য জোর দিলেও (যেমন আন্তর্জাতিক সংস্থাগুলিতে বৃহত্তর অন্তর্ভুক্তিকরণের জন্য) ব্যবস্থার সঙ্কট অবশেষে সংস্কারের প্রয়োজনীয়তার জন্য ব্যাপক স্বীকৃতি তৈরি করেছে। দ্বিতীয়ত, পশ্চিমের গুরুত্বপূর্ণ অংশীদাররা, বিশেষত ইউরোপ তাদের নতুন বন্ধু এবং মিত্রশক্তির প্রয়োজনীয়তা অনুভব করতে শুরু করেছে।

কারণ মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, যারা এই ব্যবস্থা তৈরিতে নেতৃত্ব দিয়েছিল এবং ব্যবস্থা সুষ্ঠু ভাবে পরিচালনার প্রতিশ্রুতি দিয়েছিল, তারাও মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে। তৃতীয়ত, বহুপাক্ষিকতাবাদের টানাপড়েনের একটি উল্লেখযোগ্য কারণ হল গ্লোবাল নর্থ এবং গ্লোবাল সাউথ উভয় তরফেই একাধিক অংশীদার দেশের মোহভঙ্গ, যারা বিশ্বায়নের লাভ থেকে বঞ্চিত হয়েছে বলে মনে করছে। ফলস্বরূপ, এই মোহভঙ্গ প্রকৃত পক্ষে শুধু মাত্র একাধিক সমাজে ছড়িয়ে পড়া ক্রমবর্ধমান অসাম্যের কারণে ঘটেনি। এর নেপথ্যে রয়েছে বিশ্বায়ন এবং তাকে সহজতর করে এমন বহুপাক্ষিক নিয়ম সম্পর্কে একটি বিশ্বাসযোগ্য ব্যাখ্যার অনুপস্থিতি।

উন্নত দেশগুলির বেশ কয়েকটি মূল সিদ্ধান্ত গ্রহণকারী বৃত্তে এটি যথেষ্ট আত্মানুসন্ধানের প্ররোচনা দিয়েছে। যেমন ২০২০ সালের মিউনিখ নিরাপত্তা সম্মেলন এবং তার ‘পশ্চিমহীনতা’র উপর জোর দেওয়ার মাধ্যমে এটি প্রকাশ পায়। এবং চতুর্থত, যে বিষয়টি ক্রমাগত স্বীকৃতি পাচ্ছে যে কখনও কখনও তড়িঘড়ি বিশ্বায়ন — এমন এক বিশ্বে যেখানে উৎপাদন শৃঙ্খলগুলির অস্ত্রায়ন সম্ভব — আর কোনও মতেই গ্রহণযোগ্য নয়।

বিশ্বায়নের বিকল্প এবং আরও স্থিতিশীল পন্থাগুলিকে উন্নত করে তুলতে হবে যাতে সেগুলি সমৃদ্ধি এবং নিরাপত্তা উভয়ের লক্ষ্যমাত্রাই পূরণ করতে পারে। নতুন চিন্তাভাবনা ভাগ করে নেওয়ার জন্য এ এক আদর্শ সময় এবং যদিও ভারতের বরাবরই বিশ্বকে দেওয়ার মতো অনেক কিছুই ছিল, এত দিন পরে বিশ্বও সেটিকে স্বীকৃতি দেওয়ার জন্য প্রস্তুত হতে পারে।

এই সুযোগগুলির সদ্ব্যবহার করার জন্য নিম্নলিখিত কৌশলগুলি ভারত অবলম্বন করলে সুফল পাবে। প্রথমত, ভারত ব্যবস্থা সংস্কারের জন্য একাধিক উদ্ভাবনী কৌশলের কথা বললেও সেগুলি কার্যকর করা তার একার পক্ষে সম্ভব হবে না। সমমনস্ক শক্তিগুলির সঙ্গে জোট তৈরি করাই গুরুত্বপূর্ণ।

এখানে ভারত জার্মানি ও ফ্রান্সের উদ্যোগে স্থাপিত বহুপাক্ষিকতার জোটটির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ ভাবে কাজ করে জোটটির এবং সর্বোপরি সামগ্রিক সংস্কার কর্মসূচির রূপ দিতে পারে। উন্নত এবং উন্নয়নশীল দেশগুলির সঙ্গে যৌথ ভাবে কাজ করার মাধ্যমে ভারত নিজের স্বরকে আরও জোরালো করে তুলতে পারে।

দ্বিতীয়ত বিশ্বের সাম্প্রতিক অবস্থার দিকে নজর রাখলেও ভারতকে তার নিজের সংলগ্ন অঞ্চলের প্রতি মনোযোগ দিতে হবে। আঞ্চলিক বিশ্বের সঙ্গে সংযুক্ত করার প্রকল্পই চিনের বেল্ট অ্যান্ড রোড ইনিশিয়েটিভ (বি আর আই)। ভারত একটি অনিশ্চিত ভূ-অর্থনৈতিক পরিস্থিতির সম্মুখীন হচ্ছে, যেখানে এক দিকে সে তথাকথিত ‘স্ট্রিং অব পার্লস’ দ্বারা বেষ্টিত এবং অন্য দিকে অস্ত্রায়নক্ষম আত্মনির্ভরতার বিশ্বে সম্ভাব্য দুর্বল।

বিশেষ করে মার্কিন যুক্তরাষ্ট্র, ইউরোপীয় ইউনিয়ন এবং জাপানের মতো প্রধান দেশগুলির চিনের ব্যাপক বহুমুখী বিস্তার থেকে নিজেদের গুটিয়ে নেওয়ার ফলে ভারতের সামনেও উদীয়মান চীনা প্রভাব থেকে বাঁচার একটি সম্ভাব্য পথ রয়েছে। নিরাপত্তা বলয় তৈরি, ভারসাম্য রক্ষা এবং ইউরোপ-সহ অন্যান্য দেশ—যারা একই রকম দ্বিধার সম্মুখীন, তাদের সঙ্গে জোটবদ্ধ হয়ে ভারত বহুপাক্ষিকতাবাদের একটি রূপকার হিসেবে নিজের জন্য একটি গুরুত্বপূর্ণ স্থান তৈরি করতে পারে, যে বহুপাক্ষিকতা একটি উদারনৈতিক ব্যবস্থাকেই তুলে ধরে।

তৃতীয়ত, বর্তমানে ভারত মতাদর্শের তুলনায় বাস্তববাদের উপর বেশি জোর দিলেও এমন কিছু মৌলিক মূল্যবোধকেও সে কাজে লাগাতে পারে যা তার সঙ্গে অঙ্গাঙ্গী: যেমন গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, আইনের শাসন এবং বাক স্বাধীনতা। মূল্যবোধ এই জন্যই গুরুত্বপূর্ণ, কারণ বহুপাক্ষিকতা শুধু মাত্র একটি উপায় নয়, তা নিজে কখনও স্বয়ংসম্পূর্ণ ভাবে একটি লক্ষ্য হয়ে উঠতে পারে না। বরং প্রশ্ন ওঠা জরুরি: বহুপাক্ষিকতা কীসের জন্য? একটি বহুপাক্ষিক নিয়মভিত্তিক ব্যবস্থার পক্ষে তর্ক করা কখনই যথেষ্ট নয়। বরং সর্বদা আইনের নেপথ্যে থাকা মূল্যবোধকে আলোচনা করা উচিত। মূল্যবোধের প্রতি এই মনোযোগ চিনের উত্থানের প্রেক্ষিতে বিশেষ ভাবে গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে।

সর্বোপরি পূর্বোক্ত কৌশলগুলোর কোনওটিই কাজে লাগবে না, যদি ভারত অভ্যন্তরীণ ভাবে তার নিজের স্থিতি ধরে রাখতে ব্যর্থ হয়। এ ক্ষেত্রে অর্থনীতি সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ ক্ষেত্র। সরকার যদি জীবিকার সুযোগ বৃদ্ধি এবং উন্নততর জীবনযাত্রার সুযোগ প্রদানে ব্যর্থ হয়, তা হলে দেশের জনগণ আন্তর্জাতিক স্তরে তার ক্রমবর্ধমান ভূমিকাকে মান্যতা দেবে না। বিশ্বব্যাপী সব সরকারের জন্যই অতিমারি একটি অত্যন্ত কঠিন পরীক্ষা।

ভারতের ক্ষেত্রেও একটি বিপদ আছে। অতিমারির প্রতিক্রিয়ায়, এবং সম্ভাব্য প্রতিদ্বন্দ্বীদের উপর অতিরিক্ত নির্ভরতার মূল্য দিতে গিয়ে, ভারত তার ‘আত্মনির্ভর ভারত অভিযান’ নিয়ে সম্পূর্ণ বিপরীত দিকে না ঝুঁকে পড়ে। যদি এই ‘আত্মনির্ভরতা’ কে পূর্ববর্তী দশকগুলোর ‘স্বনির্ভরতা’র অনুরূপ হতে দেখা যায়, তা হলে ভারত তার গত ৩০ বছরের কষ্টার্জিত লাভগুলোকে হারাবে। করোনাভাইরাস অতিমারি যখন ইতিমধ্যে বিশ্বব্যাপী অর্থনৈতিক মন্দার সৃষ্টি করছে, তখন সঠিক অর্থনৈতিক কৌশল বেছে নেওয়া আরও বেশি গুরুত্বপূর্ণ হবে। এই কৌশলগুলোর এক দিকে সরবরাহ শৃঙ্খলগুলোকে নাতিদীর্ঘ করা যা বর্তমান কর্মসূচির লক্ষ্য এবং অন্য দিকে বিশ্বস্ত জোটগুলোর সঙ্গে অর্থনৈতিক সংহতির সংরক্ষণ এবং সুদৃঢ়করণের মধ্যে সঠিক ভারসাম্য বজায় রাখতে হবে।

আগ্রাসী বিশ্বায়ন এবং বাজার বন্ধ করে দেওয়ার মাঝে ভারতকে তার ‘সুবর্ণ মাধ্যম’ (সোনালি পথ) খুঁজে বার করতে হবে, যা সমমনস্ক দেশগুলির ক্ষুদ্র জোটের কৌশলগত অর্থনৈতিক বৈচিত্র্যের উপর ভিত্তি করে তৈরি হবে৷ আন্তর্জাতিক ভাবেও ভারত একটি স্থিতিশীল অর্থনৈতিক বৃদ্ধির সুফল লাভ করছে সেই সব দেশের সহযোগিতায় যারা এর গণতন্ত্র, বহুত্ববাদ, উদারতাবাদ এবং আরও অনেক মূল্যবোধ ভাগ করে নেয়। এই অর্থনৈতিক বৃদ্ধির ফলে অভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক টানাপড়েন এবং ধীর বৃদ্ধির গতিতে আটকে থাকা ভারতের সামনে দর কষাকষি ও প্রভাব খাটানোর ক্ষমতা বৃদ্ধি পাবে। যাই হোক, একটি শক্তিশালী ও সংস্কারকৃত বহুপাক্ষিকতাকে টিকিয়ে রাখতে আগ্রহী দেশগুলির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিতে শক্তিশালী শিকড় থাকা বাঞ্ছনীয়। খবর: ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক