০১:৪৩ অপরাহ্ন, মঙ্গলবার, ০৫ মার্চ ২০২৪, ২২ ফাল্গুন ১৪৩০ বঙ্গাব্দ

জাতির পিতার জন্মদিনে তারুণ্যের ভাবনা

এমএসবি নাজনীন লাকী: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারুণ্যের আঁতুড়ঘর। দেশ ও দেশের জনগণের জন্য ন্যায় সংগত সংগ্রামে ভরপুর তাঁর জীবনের ঘটনা প্রবাহ। কখনোই তিনি আত্মস্বার্থের কথা ভাবেননি। ভেবেছেন নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিতের কথা আর ভেবেছেন বাংলার স্বাধীনতার কথা তারুণ্য শক্তির ধারক-বাহক হয়ে।
বঙ্গবন্ধু এক অবিসংবাদিত আদর্শের নাম। স্বার্থহীন ভাবে অপরের জন্য কাজ করার এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কারিগর, উদার ব্যক্তিত্ব, জনমানুষের নেতা, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি, সফল রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনায়ক। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম দিয়ে শুরুর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত মোট ৪৬৮২ দিন কারাগারেই কাটিয়েছেন তাঁর ২০২৩৬ দিনের জীবনে।
বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির চেতনার এক অনির্বাণ শিখা। তিনি তরুণদের নাড়ির স্পন্দন, আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা সঠিকভাবে বুঝতে পারতেন। তাই তরুণ সহযোগীদের নিয়ে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে গঠন করেছিলেন “গণতান্ত্রিক যুবলীগ”। আর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠন করেন “ছাত্রলীগ”। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশের মানুষকে না গড়ে দেশের মানুষকে মবিলাইজড না করে পরিষ্কার আদর্শ নিয়ে চলা যায় না। তাই তরুণদের চিন্তা-চেতনায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিবার্তা। তাঁর লেখা বই “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”, “কারাগারের রোজনামচা” ও “আমার দেখা নয়াচীন” আজকের তরুণদের কাছেও মুক্তির বার্তা ও প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর আপোষহীন সংগ্রামী জীবন, অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে সদা প্রতিবাদী উচ্চারণ; আজও তরুণদের সঞ্জীবনী শক্তি। তারুণ্যের প্রতি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিল অবিচল। যার অন্তরঙ্গ প্রমাণ এই বই তিনটি। তিনি তরুণদের বলছেন, “যেখানে অন্যায় অবিচার সেখানে প্রতিবাদ করো; মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার ও স্বার্থের ঘর বড় করে তাদের প্রতিরোধ করো। তিনি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতেন। মানুষে মানুষে বিভাজনকে ঘৃণা করতেন। তার দর্শন ছিল এক বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতায় আদর্শ মানবতার উদ্দীপনা। আজকের তরুণদের জন্য বিশ্বমানব হিসেবে গড়ে ওঠার এক অনন্য অবিসংবাদিত আদর্শ। ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু বলেন, “বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্ম নিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আলবদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।” যা আজকের তরুণ সমাজের অসম্প্রদায়িক ভাতৃত্ববোধের এক অমোঘ আদর্শ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের এক অসাধারণ মন্ত্র।
বঙ্গবন্ধু অবিসংবাদিত নেতা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আগে থেকেই তিনি তরুণদের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। তারুণ্যের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে তিনি নিজের ভেতর ধারণ করতেন। তাই যখন জেলে বন্দী থাকতেন তখনও তাঁর স্বক্রিয়তা তিনি তরুণদের ভেতর সঞ্চারিত করতে পারতেন। তরুণ রাজনৈতিক হিসেবে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার অনন্য সাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। আর এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে; যেখানে তরুণদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে সংঘটিত সকল ন্যায় সংগত আন্দোলন ও প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অনন্য উচ্চতার। যার ফলে পাকিস্তানি সেনাশাসকের ভিত্তি কেঁপে ওঠে ছিল। আর এর পেছনে ছিল বাংলার তারুণ্যের জাগরণ। এই জাগরণের কারিগর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই জাগরণ ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাধীনতাকামী।
বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলনে বাঙালির মুক্তির সনদ “ছয় দফা” পেশ করেন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। যা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন ২৩ মার্চ । এরপর তিনি তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগান। সারাদেশব্যাপী জনসভা, জনসংযোগ শুরু করেন। তিনি যেখানে যেতেন সেখানেই ভিড় জমে যেত তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ও তাঁর কথা শোনার জন্য। তরুণরা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে। তাঁর ঐ সময়কার প্রতিটি সমাবেশে একটি বিশেষ কোট ব্যবহার করতেন যেটা “মুজিবকোট” নামে পরিচিতি পায়। সেই কোটের মাধ্যমে ছয় দফার লালন ও প্রচার করে বাঙালি জনসাধারণকে মুক্তির পথ দেখান। সেই কোটে ছিল ছয় দফার ছয়টি বোতাম, দেশীয় কাপড়ে তৈরি এবং রং ছিল কালো। বাংলা জনসাধারণ বিশেষ করে বাংলার তরুণ সমাজ সেদিন জেগেছিল তাঁর উদ্দীপনায়। যার প্রমাণ ছাত্রদের ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান।
বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক জীবন রাজনৈতিক আদর্শে জড়ানো থাকলেও তিনি অরাজনৈতিক বঙ্গবন্ধু। তাই তো বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের গণঅভ্যুত্থানে কারাগার থেকে মুক্তি পেলে ২৩ ফেব্রুয়ারি “সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ”-এর সভাপতি ও ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ রেসকোর্স তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবর্ধনা সভায় তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন। সেদিন তরুণরা বুঝে গিয়েছিল শেখ মুজিবই বাংলার ত্রাণকর্তা। বাংলার স্বাধীনতার নায়ক।
বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমির নামকরণ করেন “বাংলাদেশ”। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে তারুণ্যের শক্তিতে বলিয়ান বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই সবই ছিল বঙ্গবন্ধুর গণজাগরণের ফল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের তালবাহানা করে। বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ ১৯৭১ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনে সর্বশ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই আন্দোলন চলে। এরপর শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। “অপারেশন বিগ বার্ড” এর মাধ্যমে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতারের পূর্বে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা যিনি তরুণ সমাজকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণদের সঙ্গী করেছেন। তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত তরুণরা দূরদর্শীতায় দীক্ষিত “স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে “জাতির পিতা ও বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক” ঘোষণা করে পল্টন ময়দানের সমাবেশে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকার রেসকোর্স তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাঙালির স্বাধীনতার ডাক দেন, তখন দেশের সব মানুষের কাছে এই বার্তা তরুণরাই পৌঁছে দেয় সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে। বাংলার প্রতিটি ঘর হয়ে উঠল এক একটি দুর্গ। তরুণদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অন্তরের সম্পর্ক থাকায় অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতার বার্তা সহজেই পৌঁছে যায় বাংলার প্রতিটি ঘরে। সচেতন হয় বাংলার মানুষ এবং সর্বতোভাবে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে তরুণরা বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেছিল স্বাধীনতার জন্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজও তরুণ সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর কর্মময় জীবন ও আদর্শ তরুণদের এগিয়ে চলার পাথেয়। বঙ্গবন্ধুই বাংলার তরুণদের সঞ্জীবনী শক্তি। বঙ্গবন্ধু কোন নির্দিষ্ট দলের আদর্শ নন, তিনি বাঙালির আদর্শ। তিনি নেতা, বাঙালি জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বিশ্বসভায় রাজনীতির কবি ও বিশ্ববন্ধু -কিংবদন্তি মহানায়ক। তাঁর সাথে কারো তুলনা চলে না। তাঁর তুলনা শুধুই তিনি। বঙ্গবন্ধু দল মত নির্বিশেষে সকলের। তিনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার নন। তিনি স্বতন্ত্র। প্রজন্ম জানুক বঙ্গবন্ধুই তারুণ্য। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে প্রতিটি তরুণের স্লোগান হোক- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: এমএসবি নাজনীন লাকী, সাহিত্য ও সমাজ কর্মী, ময়মনসিংহ, ইমেইল: msblucky16@gmail.com
ট্যাগ:
জনপ্রিয়

জাতির পিতার জন্মদিনে তারুণ্যের ভাবনা

প্রকাশ: ০৬:০২:২৫ অপরাহ্ন, শুক্রবার, ১৮ মার্চ ২০২২
এমএসবি নাজনীন লাকী: জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তারুণ্যের আঁতুড়ঘর। দেশ ও দেশের জনগণের জন্য ন্যায় সংগত সংগ্রামে ভরপুর তাঁর জীবনের ঘটনা প্রবাহ। কখনোই তিনি আত্মস্বার্থের কথা ভাবেননি। ভেবেছেন নির্যাতিত, শোষিত ও বঞ্চিতের কথা আর ভেবেছেন বাংলার স্বাধীনতার কথা তারুণ্য শক্তির ধারক-বাহক হয়ে।
বঙ্গবন্ধু এক অবিসংবাদিত আদর্শের নাম। স্বার্থহীন ভাবে অপরের জন্য কাজ করার এক অনুপ্রেরণার নাম। তিনি অন্যায়ের বিরুদ্ধে লড়াইয়ের প্রতীক, অসাম্প্রদায়িক বাংলাদেশের কারিগর, উদার ব্যক্তিত্ব, জনমানুষের নেতা, স্বাধীন ও সার্বভৌম বাংলাদেশের স্থপতি, সফল রাজনৈতিক ও রাষ্ট্রনায়ক। ব্রিটিশবিরোধী সংগ্রাম দিয়ে শুরুর পর বাংলাদেশের স্বাধীনতা অর্জন পর্যন্ত মোট ৪৬৮২ দিন কারাগারেই কাটিয়েছেন তাঁর ২০২৩৬ দিনের জীবনে।
বঙ্গবন্ধু বাঙালি জাতির চেতনার এক অনির্বাণ শিখা। তিনি তরুণদের নাড়ির স্পন্দন, আবেগ ও আকাঙ্ক্ষা সঠিকভাবে বুঝতে পারতেন। তাই তরুণ সহযোগীদের নিয়ে ১৯৪৭ সালের সেপ্টেম্বরে গঠন করেছিলেন “গণতান্ত্রিক যুবলীগ”। আর ১৯৪৮ সালের ৪ জানুয়ারি গঠন করেন “ছাত্রলীগ”। তিনি বুঝতে পেরেছিলেন যে, দেশের মানুষকে না গড়ে দেশের মানুষকে মবিলাইজড না করে পরিষ্কার আদর্শ নিয়ে চলা যায় না। তাই তরুণদের চিন্তা-চেতনায় ছড়িয়ে দিয়েছিলেন মুক্তিবার্তা। তাঁর লেখা বই “অসমাপ্ত আত্মজীবনী”, “কারাগারের রোজনামচা” ও “আমার দেখা নয়াচীন” আজকের তরুণদের কাছেও মুক্তির বার্তা ও প্রতিবাদের ভাষা। তাঁর আপোষহীন সংগ্রামী জীবন, অন্যায় জুলুমের বিরুদ্ধে সদা প্রতিবাদী উচ্চারণ; আজও তরুণদের সঞ্জীবনী শক্তি। তারুণ্যের প্রতি বঙ্গবন্ধুর বিশ্বাস ছিল অবিচল। যার অন্তরঙ্গ প্রমাণ এই বই তিনটি। তিনি তরুণদের বলছেন, “যেখানে অন্যায় অবিচার সেখানে প্রতিবাদ করো; মানুষের অসহায়ত্বকে পুঁজি করে যেসব ব্যক্তি ও প্রতিষ্ঠান ক্ষমতার ও স্বার্থের ঘর বড় করে তাদের প্রতিরোধ করো। তিনি বিচারহীনতার সংস্কৃতিকে ঘৃণা করতেন। মানুষে মানুষে বিভাজনকে ঘৃণা করতেন। তার দর্শন ছিল এক বহুত্ববাদী সংস্কৃতি ও ধর্মনিরপেক্ষতায় আদর্শ মানবতার উদ্দীপনা। আজকের তরুণদের জন্য বিশ্বমানব হিসেবে গড়ে ওঠার এক অনন্য অবিসংবাদিত আদর্শ। ধর্মনিরপেক্ষতার বিষয়ে ১৯৭২ সালের ৭ জুন সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বঙ্গবন্ধু বলেন, “বাংলাদেশ হবে ধর্মনিরপেক্ষ রাষ্ট্র। ধর্ম নিরপেক্ষ মানে ধর্মহীনতা নয়। মুসলমান মুসলমানের ধর্ম পালন করবে। হিন্দু তার ধর্ম পালন করবে। খ্রিস্টান তার ধর্ম পালন করবে। বৌদ্ধও তার নিজের ধর্ম পালন করবে। এ মাটিতে ধর্মহীনতা নাই, ধর্মনিরপেক্ষতা আছে। এখানে ধর্মের নামে ব্যবসা চলবে না। ধর্মের নামে মানুষকে লুট করে খাওয়া চলবে না। ধর্মের নামে রাজনীতি করে রাজাকার, আলবদর পয়দা করা বাংলার বুকে আর চলবে না। সাম্প্রদায়িক রাজনীতি করতে দেওয়া হবে না।” যা আজকের তরুণ সমাজের অসম্প্রদায়িক ভাতৃত্ববোধের এক অমোঘ আদর্শ। মুক্তিযুদ্ধের চেতনা বাস্তবায়নের এক অসাধারণ মন্ত্র।
বঙ্গবন্ধু অবিসংবাদিত নেতা। হাজার বছরের শ্রেষ্ঠ বাঙালি।১৯৫২ সালের ভাষা আন্দোলনের আগে থেকেই তিনি তরুণদের কাছে প্রিয় ব্যক্তিত্ব হয়ে উঠেছিলেন। তারুণ্যের স্বপ্ন ও প্রত্যাশাকে তিনি নিজের ভেতর ধারণ করতেন। তাই যখন জেলে বন্দী থাকতেন তখনও তাঁর স্বক্রিয়তা তিনি তরুণদের ভেতর সঞ্চারিত করতে পারতেন। তরুণ রাজনৈতিক হিসেবে তরুণদের উদ্বুদ্ধ করার অনন্য সাধারণ ক্ষমতা ছিল তাঁর। আর এর প্রমাণ পাওয়া যায় ১৯৫৪ সালের প্রাদেশিক নির্বাচনে; যেখানে তরুণদের উপস্থিতি ছিল উল্লেখযোগ্য। ১৯৪৫ সাল থেকে ১৯৭১ সালের মধ্যে সংঘটিত সকল ন্যায় সংগত আন্দোলন ও প্রতিটি ছাত্র আন্দোলনে বঙ্গবন্ধুর ভূমিকা ছিল অনন্য উচ্চতার। যার ফলে পাকিস্তানি সেনাশাসকের ভিত্তি কেঁপে ওঠে ছিল। আর এর পেছনে ছিল বাংলার তারুণ্যের জাগরণ। এই জাগরণের কারিগর ছিলেন বঙ্গবন্ধু। এই জাগরণ ছিল রাজনৈতিক, সাংস্কৃতিক এবং স্বাধীনতাকামী।
বঙ্গবন্ধু ১৯৬৬ সালের ৫-৬ ফেব্রুয়ারি লাহোরে বিরোধী রাজনৈতিক দলগুলোর সম্মেলনে বাঙালির মুক্তির সনদ “ছয় দফা” পেশ করেন পূর্ব পাকিস্তান তথা বাংলাদেশের স্বায়ত্তশাসন প্রতিষ্ঠার লক্ষ্যে। যা আনুষ্ঠানিকভাবে উত্থাপন করেন ২৩ মার্চ । এরপর তিনি তারুণ্যের শক্তি কাজে লাগান। সারাদেশব্যাপী জনসভা, জনসংযোগ শুরু করেন। তিনি যেখানে যেতেন সেখানেই ভিড় জমে যেত তাঁকে এক নজর দেখার জন্য ও তাঁর কথা শোনার জন্য। তরুণরা ঘন্টার পর ঘন্টা অপেক্ষা করতো ঝড় বৃষ্টি উপেক্ষা করে। তাঁর ঐ সময়কার প্রতিটি সমাবেশে একটি বিশেষ কোট ব্যবহার করতেন যেটা “মুজিবকোট” নামে পরিচিতি পায়। সেই কোটের মাধ্যমে ছয় দফার লালন ও প্রচার করে বাঙালি জনসাধারণকে মুক্তির পথ দেখান। সেই কোটে ছিল ছয় দফার ছয়টি বোতাম, দেশীয় কাপড়ে তৈরি এবং রং ছিল কালো। বাংলা জনসাধারণ বিশেষ করে বাংলার তরুণ সমাজ সেদিন জেগেছিল তাঁর উদ্দীপনায়। যার প্রমাণ ছাত্রদের ঊনসত্তরের গণঅভ্যুত্থান।
বঙ্গবন্ধুর সামগ্রিক জীবন রাজনৈতিক আদর্শে জড়ানো থাকলেও তিনি অরাজনৈতিক বঙ্গবন্ধু। তাই তো বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের ২২ ফেব্রুয়ারি ছাত্রদের গণঅভ্যুত্থানে কারাগার থেকে মুক্তি পেলে ২৩ ফেব্রুয়ারি “সর্বদলীয় ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ”-এর সভাপতি ও ডাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ রেসকোর্স তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে সংবর্ধনা সভায় তাঁকে “বঙ্গবন্ধু” উপাধিতে ভূষিত করেন। সেদিন তরুণরা বুঝে গিয়েছিল শেখ মুজিবই বাংলার ত্রাণকর্তা। বাংলার স্বাধীনতার নায়ক।
বঙ্গবন্ধু ১৯৬৯ সালের ৫ ডিসেম্বর আমাদের এই প্রিয় জন্মভূমির নামকরণ করেন “বাংলাদেশ”। ১৯৭০ সালের ৭ ডিসেম্বর সাধারণ নির্বাচনে তারুণ্যের শক্তিতে বলিয়ান বঙ্গবন্ধুর আওয়ামী লীগ নিরঙ্কুশ সংখ্যাগরিষ্ঠতা অর্জন করে। এই সবই ছিল বঙ্গবন্ধুর গণজাগরণের ফল। পাকিস্তানি শাসকগোষ্ঠী ক্ষমতা হস্তান্তরের তালবাহানা করে। বঙ্গবন্ধু ৩ মার্চ ১৯৭১ অসহযোগ আন্দোলনের ডাক দেন। এই আন্দোলনে সর্বশ্রেণীর মানুষ অংশগ্রহণ করে। ২৫ মার্চ পর্যন্ত এই আন্দোলন চলে। এরপর শুরু হয় স্বাধীনতা যুদ্ধ। “অপারেশন বিগ বার্ড” এর মাধ্যমে পাকিস্তান শাসকগোষ্ঠী কর্তৃক গ্রেফতারের পূর্বে ১৯৭১ সালের ২৬ মার্চের প্রথম প্রহরে বঙ্গবন্ধু বাংলাদেশের স্বাধীনতা ঘোষণা করেন।
বঙ্গবন্ধু এমন একজন নেতা যিনি তরুণ সমাজকে স্বপ্ন দেখিয়েছেন এবং সেই স্বপ্ন বাস্তবায়নে তরুণদের সঙ্গী করেছেন। তাঁর আদর্শে উজ্জীবিত তরুণরা দূরদর্শীতায় দীক্ষিত “স্বাধীন বাংলা ছাত্র সংগ্রাম পরিষদ” ১৯৭১ সালের ৩ মার্চ বঙ্গবন্ধুকে “জাতির পিতা ও বাংলাদেশের সর্বাধিনায়ক” ঘোষণা করে পল্টন ময়দানের সমাবেশে। ১৯৭১ সালের ৭ মার্চ বঙ্গবন্ধু যখন ঢাকার রেসকোর্স তথা সোহরাওয়ার্দী উদ্যানে বাঙালির স্বাধীনতার ডাক দেন, তখন দেশের সব মানুষের কাছে এই বার্তা তরুণরাই পৌঁছে দেয় সকল বাধা বিপত্তি উপেক্ষা করে। বাংলার প্রতিটি ঘর হয়ে উঠল এক একটি দুর্গ। তরুণদের সঙ্গে বঙ্গবন্ধুর অন্তরের সম্পর্ক থাকায় অসহযোগ আন্দোলন ও স্বাধীনতার বার্তা সহজেই পৌঁছে যায় বাংলার প্রতিটি ঘরে। সচেতন হয় বাংলার মানুষ এবং সর্বতোভাবে মুক্তির সংগ্রামে ঝাঁপিয়ে পড়ে। মুক্তিযুদ্ধে তরুণরা বুকের তাজা রক্ত উৎসর্গ করেছিল স্বাধীনতার জন্য। বঙ্গবন্ধুর ৭ মার্চের ভাষণ আজও তরুণ সমাজকে নতুন করে ভাবতে শেখায়।
বঙ্গবন্ধুর সংগ্রামমুখর কর্মময় জীবন ও আদর্শ তরুণদের এগিয়ে চলার পাথেয়। বঙ্গবন্ধুই বাংলার তরুণদের সঞ্জীবনী শক্তি। বঙ্গবন্ধু কোন নির্দিষ্ট দলের আদর্শ নন, তিনি বাঙালির আদর্শ। তিনি নেতা, বাঙালি জাতির পিতা, স্বাধীনতার ঘোষক ও স্বাধীন বাংলাদেশের স্থপতি, বিশ্বসভায় রাজনীতির কবি ও বিশ্ববন্ধু -কিংবদন্তি মহানায়ক। তাঁর সাথে কারো তুলনা চলে না। তাঁর তুলনা শুধুই তিনি। বঙ্গবন্ধু দল মত নির্বিশেষে সকলের। তিনি নির্দিষ্ট কোনো রাজনৈতিক দলের হাতিয়ার নন। তিনি স্বতন্ত্র। প্রজন্ম জানুক বঙ্গবন্ধুই তারুণ্য। বঙ্গবন্ধুই বাংলাদেশ। তাঁর জন্মবার্ষিকীতে প্রতিটি তরুণের স্লোগান হোক- জয় বাংলা, জয় বঙ্গবন্ধু।
লেখক: এমএসবি নাজনীন লাকী, সাহিত্য ও সমাজ কর্মী, ময়মনসিংহ, ইমেইল: msblucky16@gmail.com