বৃহস্পতিবার, ১২ ডিসেম্বর ২০১৯, ০৩:৫৮ পূর্বাহ্ন

শিরোনাম

চকবাজার ট্র্যাজেডি ৯ বছরে কী করেছেন তাঁরা?

চকবাজার ট্র্যাজেডি ৯ বছরে কী করেছেন তাঁরা?

জনবহুল এলাকায় দাহ্য পদার্থের ব্যবসা বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক মাত্রায় প্রাণ ও সম্পদহানি হতে পারে
জনবহুল এলাকায় দাহ্য পদার্থের ব্যবসা বন্ধ করা না গেলে ভবিষ্যতে আরও ব্যাপক মাত্রায় প্রাণ ও সম্পদহানি হতে পারে

চকবাজারে ভয়াবহ আগুনে ৬৭ জন নারী-পুরুষ ও শিশুর মর্মান্তিক মৃত্যুর পর সরকারের মন্ত্রী থেকে শুরু করে প্রশাসনিক কর্মকর্তারা সিলিন্ডার গ্যাস না রাসায়নিক পদার্থের গুদাম থেকে এর উৎপত্তি, তা নিয়ে তর্কে লিপ্ত হয়েছেন। তাঁদের এই তর্ক শুধু দায়িত্বহীন নয়, নিষ্ঠুরও। যাঁরা চকবাজারের অগ্নিকাণ্ডস্থল পরিদর্শন করেছেন, তাঁরা স্বীকার করবেন কী ভয়ংকর বিপদ সঙ্গে নিয়ে পুরান ঢাকার মানুষগুলো বসবাস করছে।

এই বিপদের কথা আমাদের সদাশয় সরকার, মাননীয় মন্ত্রী-মেয়র ও প্রশাসনিক কর্তাব্যক্তিরা জানেন না, তা নয়। জানেন বলেই যখন কোনো দুর্ঘটনা ঘটে, মানুষ মারা যায়, তখন তাঁরা দীর্ঘদিনের আড়মোড়া ভেঙে জেগে ওঠেন, ঘটনাস্থলে গিয়ে কিংবা নিজের দপ্তরে বসে নানা ধরনের নির্দেশ দেন, সহায়তার আশ্বাসবাণী শোনান, তদন্ত কমিটি করেন, কাউকে ছাড় দেওয়া হবে না বলে হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করেন।

 তারপরই সবকিছু ভুলে যান। নতুন কোনো দুর্ঘটনা বা মানবিক বিপর্যয় না হওয়া পর্যন্ত তাঁদের ঘুম ভাঙে না। চকবাজারের দুর্ঘটনার পর বর্তমান মন্ত্রী-নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা যা বলছেন, ৯ বছর আগের নিমতলীর বিপর্যয়ের পরও সেই সময়ের মন্ত্রী-নেতা ও প্রশাসনিক কর্মকর্তারা প্রায় একই কথা বলেছেন। মাঝখানে যে ৯টি বছর, এতগুলো মানুষের জীবনহানি, এত বিপুল সম্পদের ক্ষতি তাঁদের যেন কিছুই নয়।

২০১০ সালের ৩ জুন নিমতলীতে ভয়াবহ অগ্নিকাণ্ডে ১২৪ জন মানুষ মারা যাওয়ার পর সরকারি মহলে বেশ তৎপরতা দেখা গিয়েছিল। প্রধানমন্ত্রী স্বজনহারা মেয়েদের নিজের মেয়ে বলে কাছে ডেকে নিয়েছিলেন। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয় একটি তদন্ত কমিটি করল। অগ্নিনির্বাপণ দলের উদ্যোগে আরেকটি কমিটি হলো। সিটি করপোরেশন এগিয়ে এল। তারপর কী হলো তা ভুক্তভোগী কিংবা দেশবাসী জানতে পারেনি। স্বরাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের তৎকালীন অতিরিক্ত সচিব ইকবাল খান চৌধুরীর নেতৃত্বে গঠিত কমিটি অগ্নিকাণ্ড রোধে ১৭ দফা সুপারিশ করেছিল, যার ১ নম্বর দফায় পুরান ঢাকাসহ আবাসিক এলাকাগুলো থেকে রাসায়নিক পদার্থের গুদাম, কারখানা ও দোকান সরিয়ে নেওয়ার কথা বলা হয়েছিল। অন্যান্য সুপারিশের মধ্যে ছিল: পুরান ঢাকার বিভিন্ন এলাকায় প্রবেশের সুবিধার জন্য সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের অনুমতি নিয়ে সুনির্দিষ্ট নকশা অনুযায়ী ভবন নির্মাণ, অগ্নিনির্বাপণের ব্যবস্থা রাখা, রাসায়নিক ও অ্যাসিড–জাতীয় দাহ্য পদার্থ বিক্রির দোকান ও বিক্রির সনদ দেওয়ার ক্ষেত্রে সংশ্লিষ্টদের আরও সতর্ক থাকা, প্রয়োজনে এসব দাহ্য পদার্থ বিক্রি ও রক্ষণাবেক্ষণে পৃথক শিল্প এলাকা স্থাপন এবং ঘনবসতিপূর্ণ পুরান ঢাকায় অগ্নিকাণ্ডের বিস্তার রোধে ওয়াসার লাইনে ফায়ার সার্ভিসের জন্য হাইড্রেন্ট পয়েন্ট রাখা, সম্ভাব্য দুর্ঘটনা রোধে প্রতি মাসে একবার করে ট্রান্সফরমারসহ সরেজমিনে পরীক্ষা করা, সব ধরনের দুর্ঘটনা মোকাবিলায় জাতীয় পর্যায়ে সরকারের বিভিন্ন বিভাগের সমন্বয়ে জাতীয় টাস্কফোর্স গঠন, কেমিক্যাল ও কেমিক্যাল–জাতীয় দাহ্য বস্তুর লাইসেন্স আলাদা দপ্তরের পরিবর্তে সব দপ্তরের সঙ্গে সমন্বয়, সময়ের চাহিদা অনুযায়ী ফায়ার সার্ভিস ও সিভিল ডিফেন্স বিভাগের অবকাঠামো, জনবল, প্রশিক্ষণ ও সাজসরঞ্জাম আধুনিকায়নসহ শক্তিশালী করা, অগ্নিকাণ্ড সম্পর্কে জনগণের মধ্যে সচেতনতা বৃদ্ধি করা, প্রাথমিক, মাধ্যমিক ও উচ্চমাধ্যমিক স্তরের পাঠ্যসূচিতে অগ্নিনির্বাপণ, উদ্ধার ও প্রাথমিক চিকিৎসা বিষয়ে অধ্যায় রাখা বাধ্যতামূলক, কমিউনিটি সেন্টারগুলোয় নিজস্ব অগ্নিনির্বাপণ ব্যবস্থার আওতায় আনা এবং বিভিন্ন সামাজিক ও ধর্মীয় অনুষ্ঠানে ডেকোরেটরের উপকরণের সঙ্গে প্রয়োজনীয়সংখ্যক অগ্নিনির্বাপণ যন্ত্র রাখা, জরুরি ভিত্তিতে বৈধ কেমিক্যাল গুদাম বা কারখানাগুলো আবাসিক এলাকা থেকে সরিয়ে নিরাপদ স্থানে স্থানান্তর এবং অবৈধ প্রতিষ্ঠানগুলোর বিরুদ্ধে কঠোর আইনগত ব্যবস্থা গ্রহণ করা।

প্রতিবেদন পাওয়ার পর তৎকালীন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী সাহারা খাতুন বলেছিলেন, সরকার ইতিমধ্যেই পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক পদার্থের দোকান ও গুদাম সরিয়ে দেওয়ার সিদ্ধান্ত নিয়েছে। ওই এলাকায় বর্তমানে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনা করা হয়েছে। ইতিমধ্যে ভ্রাম্যমাণ আদালত পরিচালনার মাধ্যমে ১০৪টি মামলা করে ৩৫ লাখ ১৮ হাজার টাকা জরিমানা আদায় করা হয়েছে। স্বরাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামসুল হক টুকু বলেছিলেন, ‘প্রয়োজনে পুরান ঢাকাকে নতুন করেও গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হবে।’ তাঁরা পুরান ঢাকাকে নতুন সাজে সাজাবেন কী, নতুন ঢাকাই পুরান ঢাকায় রূপ নিতে চলেছে।

গত ৯ বছরে একটি সুপারিশও বাস্তবায়ন হয়েছে বলে মনে হয় না।

পুরান ঢাকার প্রতিটি ভবন এখনো অরক্ষিত ও অনিরাপদ। এগুলো করা হয়েছে নির্মাণ আইন বা বিল্ডিং কোড না মেনে। রাস্তা থেকে ভবন কিংবা দুই ভবনের মধ্যে যেটুকু খালি জায়গা রাখার কথা, তা-ও রাখা হয়নি। চকবাজার এলাকায় মিটফোর্ড সড়কটি ছাড়া সব সড়ক সরু, দুটো গাড়ি পাশাপাশি যেতে পারে না। অথচ সেসব সড়কের দুই পাশে একের পর এক উঁচু ভবন নির্মিত হচ্ছে। এক ভবনের গায়ে লাগা আরেকটি ভবন। এরই মধ্যে বিদ্যুতের সঞ্চালন লাইন, গ্যাসের লাইন, ওয়াসার লাইন। আর এসব ভবনের নিচতলা, দোতলায় রাসায়নিক পদার্থের গুদাম। তার পাশেই মানুষের বসবাস।

আইন প্রণয়নের জন্য আমাদের জনপ্রতিনিধিরা আছেন (নির্বাচনটি যেমন করেই হোক না কেন), সেই আইন প্রয়োগের জন্য প্রশাসনিক কর্মকর্তারা আছেন, আছে নানা দপ্তর-পরিদপ্তর। কিন্তু কেউ আইন অমান্য করছেন কি না, সেসব দেখার কেউ নেই।

আমরা ঢাকাকে প্রিয় শহর বলছি। অথচ শহরটি কীভাবে চলছে তার প্রতি কারও নজর নেই। বিভিন্ন আন্তর্জাতিক জরিপে দেখা যাচ্ছে, পৃথিবীর বসবাসের অযোগ্য শহরের তালিকার শীর্ষে এখন ঢাকা। তাহলে মন্ত্রীর পদমর্যাদায় আমাদের দুজন মেয়র ও স্থানীয় সরকার মন্ত্রণালয়ের সেবা সংস্থাগুলো কী করছে? দুর্ঘটনার পর মন্ত্রী-মেয়ররা ঘটনাস্থলে যান, কমিটি করেন। কিন্তু দুর্ঘটনা ঠেকানোর জন্য কার্যকর কোনো পদক্ষেপ তাঁরা নেন না। আইন অমান্যকারীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নেন না। আইন অনুযায়ী, প্রতি ভবনে অগ্নিনির্বাপণ–ব্যবস্থা থাকার কথা। পুরান ঢাকা কেন, নতুন ঢাকায়ও সব ভবনে সেই ব্যবস্থা নেই।

আমাদের দেশে আইন প্রণয়নকারীরাই আইন ভাঙেন বেশি। যাঁদের দলের জোর আছে, ক্ষমতার বা টাকার জোর আছে, তাঁরা আইন মানেন না। মন্ত্রী-নেতাদের কেউ কেউ বলছেন, সরকার পুরান ঢাকা থেকে রাসায়নিক গুদাম সরিয়ে নেওয়ার উদ্যোগ নিয়েছিল। প্রথম আলোর খবরে দেখলাম, আট বছরে রাসায়নিক পল্লির কাজ খাতা–কলমেই সীমাবদ্ধ। এখন পর্যন্ত ভূমি খুঁজে পাওয়া যায়নি। তাহলে পুরান ঢাকার রাসায়নিক কারখানা ও গুদামগুলো কোথায় সরিয়ে নেওয়া হবে?

 সরকারের মন্ত্রীরা-কর্তাব্যক্তিরা বড় বড় কথা বলেন। কিন্তু কাজ করেন না। কাজ করেন না বলেই ৯ বছর পর আরেকটি বিপর্যয় হলো। এতগুলো মানুষের প্রাণ গেল। কেন ২০১০ সালে গঠিত কমিটির সুপারিশ বাস্তবায়িত হলো না, সেই প্রশ্নের জবাব কে দেবেন? সেই সময়ে স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী যিনি ছিলেন, তিনি এখন মন্ত্রী পদে নেই। নতুন স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী এসেছেন। সেই সময়ের শিল্পমন্ত্রীও বিদায় নিয়েছেন। নতুন মন্ত্রী এসেছেন। সেই সময়ে একজন মেয়র ছিলেন, এখন আমরা দুজন মেয়র পেয়েছি। তারপরও একটি সুপারিশও বাস্তবায়িত না হওয়া চরম গাফিলতি বলেই মনে করি। তখনো এক সংস্থা আরেক সংস্থার ওপর দায় চাপাত, এখনো চাপাচ্ছে।

সাধারণত আমাদের দেশে পূর্ববর্তীদের ওপর দায় চাপিয়ে ক্ষমতাসীনেরা নিজেদের দায় এড়াতে চান। নেতারা বলেন, ‘আগের সরকার সব শেষ করে দিয়েছে’। কিন্তু ২০১০ সালে যে সরকার ক্ষমতায় ছিল, সেটিও আওয়ামী লীগের। এখনো ক্ষমতায় আছে আওয়ামী লীগ সরকার। তাহলে কার ওপর দায় চাপাবেন তাঁরা?

ভারতে রেল দুর্ঘটনায় মানুষ মারা যাওয়ায় তৎকালীন রেলমন্ত্রী লাল বাহাদুর শাস্ত্রী দায় নিয়ে পদত্যাগ করেছিলেন। বাংলাদেশে অতটা আশা করি না। তবে অন্তত নিজেদের ব্যর্থতাটা স্বীকার করুক। তাহলে প্রতিকারের ক্ষীণ আশা থাকে। আর সবকিছু ‘উন্নয়নের রোল মডেল’–এ চললে ভবিষ্যতে আরও কোনো দুর্যোগের জন্য প্রস্তুত থাকতে হবে।

সোহরাব হাসান: প্রথম আলোর যুগ্ম সম্পাদক ও কবি
sohrabhassan55@gmail.com

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© ২০১৯ দৈনিক নবযুগ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Designed and developed by Smk Ishtiak