মালদ্বীপে ভারত বিরোধী রাজনীতি

মালদ্বীপে ভারত বিরোধী রাজনীতি

‘ভাসুদাইভা কুটুম্বকম’ নীতিতে বিশ্বাসী ভারতের পররাষ্ট্রনীতি প্রায়শই প্রতিবেশী দেশগুলোর আভ্যন্তরীণ রাজনৈতিক চ্যালেঞ্জ এবং চীন-পাকিস্তান অক্ষের যৌথ প্রচেষ্টায় প্রতিকূল পরিস্থিতির মুখোমুখি হয়। সম্প্রতি এরই রেশ দেখা যাচ্ছে ভারতের অন্যতম নিকট প্রতিবেশী রাষ্ট্র মালদ্বীপে।

দক্ষিণ এশিয়ার ক্ষুদ্রতম দেশ মালদ্বীপের রাজনৈতিক পরিস্থিতি আবারও উত্তপ্ত হয়ে উঠছে। সেখানে জনপ্রিয়তা বাড়ছে ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলনের, যার পেছনে রয়েছেন সাবেক প্রেসিডেন্ট আব্দুল্লাহ ইয়ামিন। সম্প্রতি আদালত তাকে দুর্নীতি মামলায় নির্দোষ আখ্যা দিয়ে জেল থেকে মুক্তি দিলে এ আন্দোলন আরো বেগবান হয়।

দক্ষিণ এশিয়ার মধ্যে মালদ্বীপ দেশ হিসেবে ছোট হলেও পাশাপাশি দুই বৃহৎ শক্তি চীন ও ভারতের দৃষ্টি রয়েছে রাষ্ট্রটির ওপর। ভৌগোলিক অবস্থানগত গুরুত্বের কারণে দেশ দুটি মালদ্বীপের ওপর যে প্রভাব বিস্তার করতে চায়, তা প্রভাবিত করে দেশটির অভ্যন্তরীণ রাজনীতিকেও। ফলে আবদুল্লাহ ইয়ামিন তার রাজনৈতিক দর্শনে যেমন ভারত বিরোধিতাকে লক্ষ্য বানিয়েছেন, তেমনি বর্তমান প্রেসিডেন্ট ইবরাহিম সোলিহ তার পররাষ্ট্রনীতি সাজিয়েছেন ‘ইন্ডিয়া ফার্স্ট’ নীতি দিয়ে।

এরই ধারাবাহিকতায় গত ২০২০ সালে দেশটির রাজনীতি নতুন দিকে মোড় নেয়। বিরোধী দল ইয়ামিনের ইসলামিস্ট প্রগ্রেসিভ পার্টি অফ মালদ্বীপ (পিপিএম) এবং নিউজ পোর্টাল ধিয়ারেসের নেতৃত্বে শুরু হয় ‘ইন্ডিয়া আউট’ আন্দোলন, যা দিনকে দিন জোরালো হয়ে উঠেছে।

এই প্রচারাভিযানে ক্ষমতাসীন মালদ্বীপ ডেমোক্রেটিক পার্টিকেও লক্ষ্যবস্তুতে পরিণত করা হয়। এমনকি মালদ্বীপে শিক্ষা বিস্তারে কর্মরত ভারতীয় শিক্ষকদেরও দেশ ছাড়তে আল্টিমেটাম দেয়া হয়। সোশ্যাল মিডিয়ায় ক্রমাগত ট্রোল করা হয় ভারতীয় কূটনীতিকদেরও।

যদিও দেশটির সরকার এর জোরদার বিরোধিতা করছে। বর্তমান রাষ্ট্রপতি ইব্রাহিম সোলিহর সরকার এবং জোটের অংশীদাররা রীতিমতো চ্যালেঞ্জ করেছেন ইয়ামিনের ভারত বিরোধী প্রচারণাকে। একদিকে, আন্দোলনের সমর্থকদের দাবি, মালদ্বীপ থেকে তথাকথিত ‘ভারতীয় সৈনিকদের’ বের করে দিতে হবে। ইন্ডিয়া মিলিটারি আউট ব্যানারের এ আন্দোলনে সমর্থন জোগাচ্ছে ইয়ামিনের দল।

ইয়ামিন দাবি করেছেন, এই প্রচারণার লক্ষ্য কেবল মালদ্বীপের স্বাধীনতা নিশ্চিত করা। অন্যদিকে, ভারতকে মালদ্বীপের সবচেয়ে ‘ঘনিষ্ঠ ও নির্ভরযোগ্য মিত্র’ আখ্যা দিয়ে আন্দোলনকারীদের দাবিকে প্রত্যাখ্যান করেছে ইব্রাহিম সলিহর নেতৃত্বাধীন সরকার।

তবে ইয়ামিনের দলের এই প্রচারাভিযানের বিরোধীতায় নেমেছে দেশটির অন্য বড় দলগুলোও। ইতোমধ্যে সহিংসতা ছড়ানোর দায়ে গ্রেপ্তার করা হয়েছে পিপিএম এর বেশ কিছু নেতাকর্মীকে। তবুও, বিষয়টি যে আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক অদৃশ্য দাবার চাল শুরু করেছে, তা নিয়ে সন্দেহ নেই!

স্বাধীনতার পর থেকেই ভারতের সঙ্গে মালদ্বীপের জোরালো অর্থনৈতিক ও কূটনৈতিক সম্পর্ক রয়েছে। মালদ্বীপের প্রতাপশালী শাসক মামুন আবদুল গাইয়ুমের তিন দশকের শাসনামলে মালদ্বীপ ভারতের প্রভাব বলয়েই ছিলো। তবে সমস্যার শুরু হয় তাঁর সৎ ভাই আব্দুল্লাহ ইয়ামিন গাইয়ুমের ক্ষমতারোহনের পরই! ভারতের সঙ্গে মধুর এবং দ্বিপাক্ষিক লাভজনক কূটনৈতিক সম্পর্ক থাকা সত্ত্বেও চীনের নির্দেশে প্রকাশ্যে ভারতবিরোধী হয়ে উঠেন এই শাসক।

চীনের আর্থিক প্রভাবে আকৃষ্ট এই নেতা রীতিমতো আইন পাশ করে মালদ্বীপের বেশ কয়েকটি দ্বীপ দখল করতে সাহায্য করেন বেইজিংকে। ভারত মহাসাগরীয় অঞ্চলে পা রাখতে মরিয়া চীনও আগ্রাসীভাবে মদদ দেয় ইয়ামিন সরকারকে। তবে চীনা উদ্দেশ্য নিয়ে তখনই প্রশ্ন তোলা আরম্ভ করে দেশটির আপামর জনসাধারণ।

এতদ্বসত্ত্বেও ইয়ামিন আমলে গত কয়েক বছরই চীন সরকার তাদের বিনিয়োগকারীদের অনবরত মালদ্বীপে বিনিয়োগ করার জন্য উৎসাহ দিয়েছে। সেই প্রচেষ্টার ফল হিসেবে এখন পর্যন্ত চীন মালদ্বীপে যে প্রকল্পগুলো গ্রহণ করেছে, তার মধ্যে রয়েছে সড়ক ও আবাসন প্রকল্প নির্মাণ, প্রধান আন্তর্জাতিক বিমানবন্দরের সম্প্রসারণ (৩৪০০ মিটার রানওয়েসহ), বিদ্যুৎকেন্দ্রের উন্নয়ন, মালে ও হুলহুলের মধ্যে একটি সেতু নির্মাণ। এ ছাড়া মালদ্বীপের পর্যটন ও কৃষি খাতে বিনিয়োগ করেছে চীন।

ইয়ামিন সরকারের সময়ে মালদ্বীপ চীনের কাছ থেকে বড় অঙ্কের ঋণ পায়। সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের মতে, এই সংখ্যাটি ৩.১ বিলিয়ন ডলার। যে দেশটির জিডিপি ৪ বিলিয়ন ডলার, সেই তুলনায় তাদের ঋণের এই সংখ্যাটিও অনেক বড়। এত বড় অঙ্কের ঋণ পরিশোধ নিয়ে চিন্তায় আছে মালদ্বীপ সরকার। তাছাড়া, চীনের ঋণের ফাঁদে ফেলার বাণিজ্য নীতিও ইতোমধ্যে বহুল আলোচিত হয়। এর প্রেক্ষিতেই পতন ঘটে ইয়ামিন সরকারের। ক্ষমতায় আসে ইব্রাহিম সোলিহর সরকার।

নয়াদিল্লির সাথে ঘনিষ্ঠ সম্পর্ক পুনঃ প্রতিষ্ঠায় মন দেন তিনি। এদিকে, ভারত সরকারও সোলিহ সরকারকে সর্বোচ্চ সমর্থন দেয়। প্রধানমন্ত্রী মোদি ঘোষণা দেন, মালদ্বীপের স্থিতিশীলতা এবং নিরাপত্তা ভারতের জাতীয় স্বার্থের সাথে সরাসরি জড়িত এবং মালদ্বীপে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে শক্তিশালী করার প্রচেষ্টাকে সমর্থন করে।”

এরই সুবাদে, পর্যটন, কর, সংরক্ষণ এবং সার্ক স্যাটেলাইটে প্রবেশাধিকার সংক্রান্ত নতুন চুক্তিও স্বাক্ষরিত হয়েছে ভারত-মালদ্বীপের। পাশাপাশি করোনা টেস্টিং কিট এবং ভ্যাকসিন দিয়ে মালদ্বীপের পাশে দাঁড়ায় ভারত। সদ্য শেষ হওয়া ভারতের বাজেট অধিবেশনেও দেশটির জন্য বড় অঙ্কের অর্থ সহায়তা বরাদ্দ রাখে মোদী সরকার।

মালদ্বীপের রাজস্বের এখনও সিংহভাগ জোগানদাতা ভারতীয় পর্যটকেরা। ভারতের এসব প্রচেষ্টা নিঃসন্দেহে মালদ্বীপের জনসাধারণকে আকৃষ্ট করেছে, যা অনেকাংশে স্তিমিত করেছে ইয়ামিনের দলের প্রচার-প্রচারণা। তবে আঞ্চলিক রাজনীতির খেলা এখনও চালু।

কিছু মিডিয়া অনবরত ভারতীয় কূটনীতিকদের সুনাম নষ্ট করতে পক্ষপাতদুষ্ট প্রচার করে যাচ্ছে। জাল টুইটার একাউন্ট ব্যবহার করে আরডিএক্স বোমার মাধ্যমে ভারতীয় হাইকমিশনকে উড়িয়ে দেওয়ার আহবানও জানানো হয়েছে। ইতোমধ্যে ব্যক্তিটিকে গ্রেপ্তার করা হলেও এটি নিঃসন্দেহে মালদ্বীপের শাসক শ্রেণীর জন্য অস্বস্তির কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে।

এসব সহিংস ঘটনায় ভারতের বিরুদ্ধে পাকিস্তান ও মালদ্বীপের চরমপন্থী দলগুলোর সংশ্লিষ্টতা একেবারেই উড়িয়ে দেয়া যায়না। এখানে মনে রাখতে হবে, মালদ্বীপে দিনকে দিন ইসলামী কট্টরপন্থীদের সংখ্যা বাড়ছে এবং আইএসআইএস -এ যাওয়া সবচেয়ে বেশি তরুণ মালদ্বীপের নাগরিক।

দেশটির সংবাদমাধ্যমে ইসলামিক কট্টরপন্থীরা ক্রমাগত সোলিহ সরকারের সমালোচনা করছে। এমন পরিস্থিতিতে মালদ্বীপের সাধারণ নির্বাচনও সামনেই। এ নির্বাচনকে ঘিরে তীব্র প্রতিদ্বন্দ্বীতা তৈরী হয়েছে বর্তমান প্রেসিডেন্ট সোলিহ এবং সাবেক প্রেসিডেন্ট নাশিদের মধ্যে। তাই ভারতপন্থীদের এই লড়াইয়ে চীনপন্থী ইয়ামিন সুবিধা পেতে পারেন, এই বিষয়টিও উড়িয়ে দেয়া যায়না।

তবে বিষয়টির সহজ সুন্দর সমাধানে তৎপর মোদী সরকার। মালদ্বীপের সঙ্গে উন্নয়নমূলক অংশীদারিত্ব বহুগুণে বাড়ানোর পাশাপাশি দেশটির সহযোগিতায় বিভিন্ন কর্মসূচি হাতে নিচ্ছে নয়াদিল্লী। সন্ত্রাসবাদের বিরুদ্ধে দৃঢ় অবস্থান গ্রহণ করেছে উভয় সরকার। পণ্য পরিবহণ ও বাণিজ্য সেবার ক্ষেত্রেও দুই দেশের জনসাধারণের মধ্যে যোগাযোগ বৃদ্ধি পেয়েছে।

এদিকে, মালদ্বীপের দক্ষিণে আদ্দুতে একটি কনস্যুলেট খোলার ঘোষণা দিয়েছে ভারত। এটি অবশ্য নতুন এক বিতর্কের সৃষ্টি করেছে। তবে এই ঘোষণাটি স্থানীয় জনগণকে সহজে ভারতীয় ভিসা দেয়ার প্রয়াসেই করা হয়েছে বলে জানা যায়। তথাপি ভারত বিরোধী লবিগুলো এঁকে কেন্দ্র করে এক বিতর্ক সৃষ্টির চেষ্টা চালিয়ে যাচ্ছে।

সর্বোপরি, মাত্র ৫ লাখ জনসংখ্যার দেশ মালদ্বীপের রাজনীতি এখন আবর্তিত হচ্ছে এশিয়ার বৃহৎ দুই দেশের মধ্যকার বৈরিতাকে ঘিরে। ভারতের সকল প্রতিবেশী দেশের মতো মালদ্বীপেও ভারত-বিরোধী কর্মকান্ড বাঁড়াতে তৎপর পাকিস্তান-চীন অক্ষ। একদিকে পাকিস্তানের সন্ত্রাসীরা, অন্যদিকে চীনের অঢেল অর্থ। দুই মিলে ভারতের বিরুদ্ধে কঠিন এক জোট তৈরী। এমতাবস্থায়, প্রতিবেশী দেশগুলোও যদি ভারতের বিরুদ্ধে ‘চায়না কার্ড’ খেলা আরম্ভ করে, সেখানে ভারতকে অবশ্যই নতুন ভাবে ভাবতে হবে সবই।

লেখক: রাষ্ট্রদূত পিনাক রঞ্জন চক্রবর্তী, ভারতীয় পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের প্রাক্তন সচিব এবং বাংলাদেশে নিযুক্ত সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার। বর্তমানে তিনি ওআরএফ -এর ভিজিটিং ফেলো হিসেবে দায়িত্ব পালন করছেন। (লেখাটি ইন্ডিয়া নিউজ নেটওয়ার্ক থেকে গৃহীত)

 

মন্তব্য করুন

আপনার ইমেইল প্রকাশ করা হবে না।

*