মঙ্গলবার, ০৪ অগাস্ট ২০২০, ০৬:০৬ পূর্বাহ্ন

সোনার বাংলার বিনির্মানে প্রয়োজন মাদক মুক্ত বাংলা

সোনার বাংলার বিনির্মানে প্রয়োজন মাদক মুক্ত বাংলা

মাদক

মুন্ তাসির মামুন ঊষাণ: মাদক, এই তিনটি অক্ষরে লুকিয়ে আছে আমাদের সামাজিক, পারিবারিক এবং জাতীয় পর্যায়ে অবক্ষয়ের মূল উপাদান। এই মাদকের থাবায় প্রতিনিয়ত ঝরে যাচ্ছে লাখ লাখ মানুষের আশা,ভরসা ও স্বপ্ন। যার জন্য সবচেয়ে বেশি হুমকির মুখে আমাদের যুব সমাজ। প্রতিনিয়তই বেড়ে চলেছে মাদকের জন্য নানা ধরনের অপরাধ। চুরি,ডাকাতি, ছিনতাই ইত্যাদির নেপথ্যে মাদকের শক্ত একটি প্রভাব বিদ্যমান।

দেশগড়ার কারিগর সম্ভাবনাময় তরুণ প্রজন্মকে ধ্বংসের দিকে নিয়ে যাচ্ছে মাদক। মাদকের কারণেই বুক ফাটা কান্নায় পৃথিবীর আকাশ বাতাস ভারি হয়ে যায়। রাতের অন্ধকার আরও নিঃসঙ্গ হয়ে ওঠে পরিবারগুলোতে। এক জরিপে দেখা গেছে, বর্তমান দেশে মাদকাসক্তদের সংখ্যা কমপক্ষে ৫০ লাখ। কোন কোন সংস্থার মতে ৭০ লাখ। নব্বইয়ের দশকে যার পরিমাণ রেকর্ড করা হয় ১০ লাখেরও কম এবং মাদকসেবীদের মধ্যে ৮০ শতাংশই যুবক, তাদের ৪৩ শতাংশ বেকার। ৫০ শতাংশ অপরাধের সঙ্গে জড়িত রয়েছে। কিছুদিন আগেও যারা ফেনসিডিলে আসক্ত ছিল তাদের অধিকাংশই এখন ইয়াবাতে আসক্ত। সম্প্রতি ইয়াবা আমাদের দেশের তরুণ যুবসমাজকে গ্রাস করেছে। প্রতিদিন যেমন ইয়াবা ধরা হচ্ছে তেমনি প্রতিদিন হাজার হাজার পিস ইয়াবা তরুণরা গ্রহণ করছে।

বাংলাদেশের মাদক পরিস্থিতি নিয়ে জাতিসংঘের এক প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, দেশে মাদকাসক্তদের মধ্যে ৮৪ ভাগ পুরুষ, ১৬ ভাগ নারী। সমাজের বিত্তশালী ব্যক্তি থেকে শুরু করে নারী ও শিশু-কিশোররাও মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত।

ওই প্রতিবেদনে আরও বলা হয়েছে, দেশজুড়ে প্রায় সাড়ে তিন লাখ মানুষ নানাভাবে মাদক ব্যবসার সঙ্গে জড়িত। আর উচ্চশিক্ষিতের সংখ্যা ১৫ শতাংশ। তবে আরও বেশ কয়েকটি সংস্থার তথ্যানুযায়ী, অবৈধ মাদকদ্রব্য আমদানির জন্য প্রতি বছর ১০ হাজার কোটিরও বেশি টাকার মুদ্রা বিদেশে পাচার হচ্ছে।

সমাজের দরিদ্র শ্রেণি দিনমজুর হতে শুরু করে স্কুল কলেজ, বিশ্বদ্যিালয়ের ছাত্র-ছাত্রী এবং বিত্তশালী শ্রেণির মাঝে সকল অবৈধ মাদক এর ব্যবহার বেড়ে চলেছে। এটা প্রতিরোধে সরকারের পাশাপাশি বেসরকারী সংগঠন এনজিও, শিক্ষক, মসজিদের ইমাম বা অন্যান্য ধর্মের বিশিষ্টজন, পিতামাতা, অভিভাবক, জনপ্রতিনিধিসহ সমাজের সকল শ্রেণি-পেশার মানুষকে এগিয়ে আসতে হবে। স্ব স্ব ক্ষেত্রে থেকে তারা তাদের বক্তব্য ও কর্মের মাধ্যমে জনগণকে মাদকের বিরুদ্ধে সচেতন করে তুলবেন এটা আমাদের প্রত্যাশা। শিক্ষা প্রতিষ্ঠানের সকল শিক্ষক এবং কর্মকর্তা/কর্মচারীরা যেন পাঠ্য বইয়ের শিক্ষা প্রদানের পাশাপাশি নৈতিকতা শিক্ষা দেন ও শিক্ষাঙ্গণে ছাত্রছাত্রীদের চলাফেরার প্রতি সজাগ দৃষ্টি রাখেন। আমরা যেন আমাদের সন্তানদের প্রতি দায়িত্বশীল হই এবং খোঁজখবর রাখি যেন তারা সমাজ বা শিক্ষাঙ্গন হতে এ খারাপ অভ্যাসে জড়িয়ে না পড়ে।

ধর্মীয় অনুশাসন সঠিকভাবে মেনে না চলায় যুবসমাজে মাদকাসক্তের সংখ্যা দিন দিন আশঙ্কাজনকভাবে বেড়েই চলেছে। কৌতূহল, পারিবারিক অশান্তি, বেকারত্ব, প্রেমে ব্যর্থতা, বন্ধুদের কুপ্রচারণা, অসৎ সঙ্গ, নানা রকম হতাশা ও আকাশ-সংস্কৃতির নেতিবাচক প্রভাব উঠতি বয়সের ছেলেমেয়েদের মাদকাসক্ত হয়ে পড়ার মূল কারণ। যারা নেশা করে তাদের অধিকাংশই জানে যে নেশা কোনো রকম উপকারী বা ভালো কাজ নয় এবং এটা মানুষের জীবনীশক্তি বিনষ্ট করে। হাদিস শরিফে বর্ণিত আছে যে ‘মাদক ও ইমান একত্র হতে পারে না।’ (নাসাঈ)।

মাদক সেবনকারীর দেহমন, চেতনা, মনন, প্রেষণা, আবেগ, বিচারবুদ্ধি সবই মাদকের নিয়ন্ত্রণে চলে যায়। নেশা ও মাদকাসক্তির ভয়াবহতা থেকে মানুষকে মুক্ত রাখার জন্য রাসুলুল্লাহ (সা.) ঘোষণা করেছেন, ‘নেশাজাতীয় যেকোনো দ্রব্যই মাদক, আর যাবতীয় মাদকই হারাম।’ (মুসলিম) অন্য হাদিসে আছে, ‘যেসব পানীয়তে নেশা সৃষ্টি হয় তা সবই হারাম।’ (বুখারি ও মুসলিম) মাদকমুক্ত সমাজ গঠনে কঠোর ভীতি প্রদর্শন করে নবী করিম (সা.) সতর্কবাণী উচ্চারণ করেছেন, ‘মাদকদ্রব্য সব অপকর্ম ও অশ্লীলতার মূল।’ (মুসলিম)

মাদক নিরাময়ে চাই পরিবারের আন্তরিকতা ও পারস্পরিক ভালোবাসা। ধর্মভীরু পরিবারের পিতা-মাতাই সন্তানকে মাদকের করাল গ্রাস থেকে রক্ষা করতে পারেন। পিতা-মাতারা যদি তাঁদের ব্যস্ত সময়ের একটা নির্দিষ্ট অংশ সন্তানের জন্য বরাদ্দ রাখেন, তাদের ইসলামের বিধিবিধান ও ধর্মীয় অনুশাসন শিক্ষা দেন, তাদের সঙ্গে সদাচরণ করেন, তাদের জীবনের জটিল সমস্যাবলি সমাধানে অত্যন্ত সচেতন ও মনোযোগী হন, তাহলেই যুবসমাজে মাদকাসক্তির প্রতিরোধ বহুলাংশে সম্ভব। মাদকদ্রব্য পরিত্যাগের ব্যাপারে আসক্ত ব্যক্তিদের স্বভাব বদলে ফেলে ধর্মভীরু ও আত্মপ্রত্যয়ী হওয়ার জন্য আন্তরিকভাবে সচেষ্ট হওয়া দরকার। একই সঙ্গে মাদক প্রতিরোধ করতে হলে ব্যাপক গণসচেতনতা গড়ে তুলতে হবে। অভিভাবক ও মুরব্বিদের নিয়ে প্রতিটি পাড়া-মহল্লায় মাদক প্রতিরোধ কমিটি গঠন করতে হবে। মাদকাসক্তি ত্যাগে আসক্তদের উৎসাহিত ও ধর্মীয় অনুশাসন মেনে চলার জন্য সর্বস্তরের জনগণকে উদ্বুদ্ধ করতে জাতি-ধর্ম-বর্ণ দলমত-নির্বিশেষে দেশের তিন লাখ মসজিদের ইমাম বা ধর্মীয় নেতাদেরও অগ্রণী ভূমিকা পালন করা বাঞ্ছনীয়।

আমাদের ব্যক্তি, পরিবার ও সমাজজীবন থেকে মাদকদ্রব্য উৎখাত এবং মাদকাসক্তি নির্মূল করতে হলে আইন প্রয়োগের পাশাপাশি দরকার মানুষের বিবেক ও মূল্যবোধের জাগরণ, সচেতনতা বৃদ্ধি, সামাজিক উদ্বুদ্ধকরণ এবং ব্যাপক সামাজিক আন্দোলন। এর জন্য প্রত্যেক ব্যক্তির মধ্যে সচেতনতা জাগাতে হবে। প্রতিটি পরিবারপ্রধানকে সতর্ক ও সক্রিয় হতে হবে। পারিবারিক অনুশাসন, নৈতিক মূল্যবোধ ও সুস্থ ব্যক্তিত্বের বিকাশ ঘটাতে হবে। মাদকের বিরুদ্ধে বর্তমান বিশ্বব্যাপী যে যুদ্ধ ও আন্দোলন, তার সূতিকাগার হতে হবে পরিবার। জনগণকে প্রাণঘাতী নেশার ভয়াবহ থাবা থেকে রক্ষার জন্য মাদকের বিরুদ্ধে গণমাধ্যমকে উদ্বুদ্ধ করতে হবে, এর কুফল সম্পর্কে ব্যাপকভাবে তথ্য প্রদান করতে হবে। ‘মাদক যেন আমাদের নিয়ন্ত্রণ না করে এবং আমরাই মাদককে নিয়ন্ত্রণ করব।

দিনশেষে আমরাই জিততে চাই মাদকের বিরুদ্ধে। আমরাই পারি আমাদের মাদকমুক্ত সোনার বাংলা গড়ে তুলতে।

লেখক: মুন্ তাসির মামুন ঊষাণ, মাদক বিরোধী কর্ম পরিকল্পনা ও সচেতনতা বিষয়ক সম্পাদক, সঞ্জীবন, ময়মনসিংহ জেলা শাখা

 

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© ২০১৯ দৈনিক নবযুগ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Designed and developed by Smk Ishtiak