শনিবার, ১৪ ডিসেম্বর ২০১৯, ০১:০৩ অপরাহ্ন

শিরোনাম
জাপানের প্রধানমন্ত্রী শিনজো আবে তার ভারত সফর স্থগিত করেছেন বিপিএলের জন্য শ্যালিকার বিয়েতে যাননি শোয়েব শহীদ বুদ্ধিজীবীদের প্রতি রাষ্ট্রপতি-প্রধানমন্ত্রীর শ্রদ্ধা দক্ষিণ এশিয়ায় সবচেয়ে ক্ষমতাধর নারী শেখ হাসিনা আমার বাড়ি আমার খামার প্রকল্পের অর্ধ – বার্ষিক সম্মেলন অনুষ্ঠিত ময়মনসিংহ বিভাগে এই প্রথম ব্যতিক্রমী বইমেলা – ইকরামুল হক টিটু বিশ্বব্যাংকের অর্থায়নে দেশের পশ্চিমাঞ্চলের জেলাগুলোতে চলছে ‘ট্রাফিক সার্ভে’ পপুলার লাইফ ইনস্যুরেন্স কোম্পানী লিমিটেড বার্ষিক ক্লোজিং প্রস্তুতি সভা অনুষ্ঠিত বিমানে প্রতি কেজি পেঁয়াজের ভাড়া ১৫০ টাকা ‘প্রফেশনাল যৌনকর্মী’ দিয়ে ছবি বানানো হচ্ছে: পপি

ঘুরে এলাম আমের শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

ঘুরে এলাম আমের শহর চাঁপাইনবাবগঞ্জ থেকে

চাঁপাইনবাবগঞ্জ

জিল্লুর রহমান রিয়াদ: ছোটবেলা থেকেই ভ্রমণের প্রতি একটা আলাদা ভালো লাগা কিংবা ঝোঁক কাজ করতো। কিশোর বয়স থেকেই স্বপ্ন দেখি সারাদেশ ঘুরে বেড়ানোর। সে ধারাবাহিকতায় দেশের প্রায় অর্ধেকেরও বেশি জেলা ভ্রমণের সৌভাগ্য ইতোমধ্যে মহান আল্লাহ আমাকে দিয়েছেন। এতোগুলো জেলা ভ্রমণের পর হঠাত একদিন পুরোনো স্মৃতির এলবাম ঘেটে দেখলাম রাজশাহী বিভাগের ৮ টি জেলার মাঝে শুধুমাত্র রাজশাহী জেলাটাই ভ্রমণ করা হয়েছে। সেও ২০১৬ সালের কথা, বিশ্ববিদ্যালয় ভর্তি পরীক্ষার সময় রাজশাহী বিশ্ববিদ্যালয় ভ্রমণের মধ্যেই যা সীমাবদ্ধ! তাই সিদ্ধান্ত নিলাম, এরপরের গন্তব্য রাজশাহী বিভাগেই হবে। পাবনা থেকে শুরু করে নাটোর এবং এরপর রাজশাহী হয়ে চাঁপাই নবাবগঞ্জ গিয়ে যাত্রা শেষ করব। কিন্তু তখন এপ্রিল মাস। এদিকে চাঁপাই যাব আর আম খাব না, তা তো হতে পারে না। তাই অপেক্ষার প্রহর গুনতে লাগলাম। অবশেষে জুলাই মাসের প্রথম সপ্তাহে এসে আলহামদুলিল্লাহ ভ্রমণের সুযোগ হয় দেশের সবচেয়ে সমৃদ্ধ ঐতিহাসিক অঞ্চলগুলোর একটি, রাজশাহী বিভাগে। আজকের এ লিখাটি মূলত দর্শকদের চাঁপাইনবাবগঞ্জ ভ্রমণ সম্পর্কে ধারণা দিতেই লিখা।
সাধারণত নতুন কোনো স্থানে ভ্রমণের ক্ষেত্রে আমি দুই বা তিন জনের ক্ষুদ্র দলকেই বেশী প্রাধান্য দিই। কেননা এতে মতপার্থক্য সৃষ্টির সম্ভাবনা একেবারেই কমে যায় এবং লোকসংখ্যা কম হওয়ার কারণে সংশ্লিষ্ট এলাকার সাধারণ মানুষের সাথে মিশে যাওয়া যায়। তাদের জীবন – জীবিকা কিংবা আঞ্চলিক সংস্কৃতি একদম কাছ থেকে অনুভব করা যায়। ডিপার্টমেন্ট এর বন্ধু এনামুলকে রাজশাহী ভ্রমণের কথা জানাতেই সে এককথায় রাজী হয়ে গেলো। এর আগেও আমরা একসাথে চট্টগ্রাম অঞ্চল ও ইলিশের দেশ চাঁদপুর ভ্রমণ করেছিলাম। এনামুল রাজী হওয়ায় নতুন করে আর কাউকে জানানোর বিশেষ প্রয়োজন পড়লো না।
অবশেষে গত ৪ জুলাই, ২০১৯ ইং (বৃহস্পতিবার) রাত সাড়ে ১০ টা নাগাদ “ন্যাশনাল ট্রাভেলস” এর গাড়ীতে বাংলাদেশের সর্ব পশ্চিমের জেলা ‘চাঁপাইনবাবগঞ্জ’ এর টিকিট কনফার্ম করি। প্রথমে পাবনা যাবার পরিকল্পনা থাকলেও মূলত এনামুল এর আগ্রহে আমের দেশ চাঁপাই থেকে আমাদের ভ্রমণ শুরু করি। রাত ১০ টা ৩০ মিনিটে সাভার কাউন্টারে গাড়ী পৌঁছানোর কথা থাকলেও ২০ মিনিট দেরীতে ১০ টা ৫০ মিনিটে গাড়ী এসে সাভার পৌঁছে। এরপরই শুরু হয় আমাদের বহুল প্রত্যাশিত ভ্রমণ। নবীনগর, বাইপাইল ও চন্দ্রা স্টেশন থেকে যাত্রী উঠানোর পর শুরু হয় আমাদের বিরতিহীন পথচলা। মাঝরাতে সিরাজগঞ্জে যাত্রাবিরতি হলেও, আমরা ঘুমিয়েই কাটিয়েছি সময়টুকু। ভোরের সূর্য যখন পুব আকাশে উকি দিচ্ছিলো, তখন আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরের বিশ্বরোড মোড়ে গাড়ী থেকে নামলাম।
চাঁপাইনবাবগঞ্জ

                                                                        লেখক, জিল্লুর রহমান রিয়াদ

অচেনা শহরে নেমে এবারে ঘুরে বেড়ানোর পালা। শহরের শাহ্ নেয়ামতুল্লাহ কলেজ মসজিদের ওযুখানায় ফ্রেশ হয়ে একটু বিশ্রাম নিয়ে নিলাম। যদিও নবাবগঞ্জের কোথায় কোথায় আমরা ঘুরতে যাব এ সম্পর্কে যথেষ্ট ধারণা আগেই নিয়েছিলাম, তারপরও দর্শনীয় স্থান ও পরিবহন সম্পর্কে স্থানীয়দের সাথে কিছুক্ষণ কথা বলে নিই। এরপর গ্যাস চালিত ৩ চাকার মাহিন্দ্রা গাড়ীতে করে আমরা ছোট সোনা মসজিদ দেখার উদ্দেশ্যে রওনা দিলাম। এসময় গাড়ীতে স্থানীয় একজনের সাথে পরিচয় হয়। তিনি সোনা মসজিদ বর্ডার অতিক্রম করে ভারত যাওয়ার উদ্দেশে রওনা হয়েছেন। ছোট সোনা মসজিদ এর ৩ কি.মি. উত্তরেই সোনা মসজিদ বর্ডার বা জিরো পয়েন্ট। আমরা তাৎক্ষণিক ভাবে প্রথমে জিরো পয়েন্ট ও বর্ডার পরিদর্শনের সিদ্ধান্ত নেই। অতঃপর প্রায় দেড় ঘণ্টা পর আমরা চাঁপাই শহর থেকে ৩৭ কি.মি. দূরের জিরো পয়েন্ট পৌঁছাই।
জিরোপয়েন্টে কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করে ও ছবি তুলার পর এখানেই আমরা সকালের নাস্তা পর্ব সেরে ফেলি। আমাদের নতুন বন্ধু স্থলবন্দর ও কাস্টমস এর বিভিন্ন কাজ সম্পর্কে আমাদের অবহিত করেন এবং ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে দেখান। এই অঞ্চলের ওপারেই হচ্ছে পশ্চিমবঙ্গের মালদহ জেলা। উনার থেকেই জানতে পারি, চাঁপাই নবাবগঞ্জ যেমন সারা বাংলাদেশে আমের জন্য বিখ্যাত, তেমনি মালদহ জেলা সারা ভারতে আমের জন্য বিখ্যাত। জিরো পয়েন্টের পাশেই “বালিয়াদিঘী” নামে অনেক বড় একটি দিঘী রয়েছে। এখান থেকে আম বাগানের ভেতর দিয়ে পূর্ব দিকে ১০ মিনিটের মত হাটলেই ঐতিহাসিক খনিয়াদিঘি মসজিদের অবস্থান। ধারণা করা হয় ১৫’দশ শতকে কোন এক রাজবিবি মসজিদটি নির্মাণ করেন। মুঘল স্থাপত্যশৈলীর এ মসজিদটিতে ৪ টি গম্বুজ রয়েছে। এটি স্থানীয়ভাবে চামচিকা মসজিদ নামেও পরিচিত। এই মসজিদের পাশে খনিয়া দিঘী নামে বিশাল এক দিঘী রয়েছে।
এরপর আমরা অটো রিক্সাতে করে ছোট সোনা মসজিদের দিকে রওনা করলাম। ছোট সোনা মসজিদ বাংলাদেশের অন্যতম প্রাচীন মসজিদ। প্রাচীন বাংলার রাজধানী গৌড় নগরীর উপকণ্ঠে পিরোজপুর গ্রামে এ স্থাপনাটি নির্মিত হয়েছিল, যা বর্তমানে চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার শিবগঞ্জ থানার অধীনে পড়েছে। সুলতান আলা-উদ-দীন শাহ এর শাসনামলে (১৪৯৩-১৫১৯ খ্রিষ্টাব্দে) ওয়ালি মোহাম্মদ নামে এক ব্যক্তি এই মসজিদ নির্মাণ করেছিলেন। মসজিদটি মুসলিম স্থাপত্যের অন্যতম নিদর্শন। এটি হোসেন-শাহ স্থাপত্য রীতিতে তৈরি। পাথর, ইট, টেরাকোটা ও টাইলস দিয়ে তৈরি মসজিদটিতে ১৫ টি গম্বুজ রয়েছে। বর্তমানে মসজিদটির দক্ষিণ-পূর্ব দিকে দুটো কবর রয়েছে। কবর দুটো ১৯৭১ সালের মুক্তিযুদ্ধে শহীদ বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর এবং ৭নং সেক্টরের সেক্টর কমান্ডার বীর মুক্তিযোদ্ধা মেজর নাজমুল হক এর। মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীর মুক্তিবাহিনীর ৭নং সেক্টরের একজন কর্মকর্তা ছিলেন। মহানন্দা নদীর তীরে শত্রুর প্রতিরক্ষা ভাঙ্গার প্রচেষ্টার সময় ১৪ই ডিসেম্বর তিনি শহীদ হন। ১৯৭১ সালের ১৫ ডিসেম্বর শহীদ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দিন জাহাঙ্গীরের মৃতদেহ ঐতিহাসিক সোনা মসজিদ প্রাঙ্গণে সমাহিত করা হয়।
ছোটা সোনা মসজিদের সামনেই “বীরশ্রেষ্ঠ ক্যাপ্টেন মহিউদ্দীন জাহাঙ্গীর ডিগ্রী কলেজ” অবস্থিত। কলেজটির পাশে কয়েকটা বড় বড় আমের বাগান আছে। আমরা ঘুরে ঘুরে আমের বাগানগুলো দেখি এবং এখান থেকে পাকা আম কিনে খাই। সাধারণত আমের বাগান থেকে আম বিক্রি করার প্রচলন নেই। তারপরও আমাদের বারবার অনুরোধের প্রেক্ষিতে অনেকক্ষণ চেষ্টা করে পাকা আম খুঁজে দিয়েছিলেন একজন। বাগানে গাছ থেকে নিজ হাতে আম পেড়ে খাওয়ার মজা লিখে প্রকাশ করা সম্ভব নয়। সেখান থেকে এবারে আমরা কানসাট বাজারে চলে আসি। কানসাট বাজার চাঁপাইনবাবগঞ্জ জেলার একটি বিখ্যাত আমের বাজার। স্থানীয়রা সাইকেল কিংবা ভ্যানে করে আম নিয়ে আসছে আর পাইকাররা দেখে দেখে সেগুলো কিনছিলেন। নির্দিষ্ট বাজারের বাইরেও দীর্ঘ এলাকা ব্যাপী রাস্তার পাশে আম কেনা বেঁচার হাট বসে।
কানসাট বাজার থেকে পুনরায় অটোতে করে আমরা মনাকষা বাজারের দিকে রওনা হই। মনাকষা হচ্ছে বাংলাদেশের সর্ব পশ্চিমের স্থান বা ইউনিয়ন। মনাকষা পৌঁছতে পৌঁছতে গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি শুরু হয়ে গেলো। বাজারের মোড়ে নেমে আমরা একটি চায়ের দোকানে ঢুকলাম। অল্প বৃষ্টির মাঝেই আমরা হেঁটে হেঁটে বাজার ও আশপাশের এলাকা পরিদর্শন করি। মনাকষা এখনও অবধি পর্যটন স্থান হিসেবে প্রসিদ্ধি লাভ না করায় খুব বেশী কিছু নেই এখানে। তারপরও কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি ও রাস্তার পাশে ছবি তুলার পর আমরা শিবগঞ্জ বাজারের দিকে রওনা দিলাম। শিবগঞ্জ বাংলাদেশের সর্ব পশ্চিমের উপজেলা। শিবগঞ্জ থেকেই সিএনজি যোগে আমরা চাঁপাইনবাবগঞ্জ শহরে ফিরে আসি।

                                                                       ভ্রমণসঙ্গীদের সঙ্গে লেখক

চাঁপাই নবাবগঞ্জ শহরে পৌঁছে এক্সিম ব্যাংক কৃষি বিশ্ববিদ্যালয়ে যাই। এই বিশ্ববিদ্যালয়ের ছাত্র আমার এলাকার বন্ধু ফুয়াদ এ সময় আমাদের সাথে মিলিত হয়। তার সাথে মিলে আমরা চাঁপাই এর বিখ্যাত সন্দেশ খেয়ে নিলাম। তারপর চাঁপাই নবাবগঞ্জ পৌরসভা মসজিদে জুম্মার নামাযের পর ফুয়াদের বাসায় গিয়ে দুপুরের খাবার পর্ব সেরে নিই আমরা। সেখান থেকে বিদায় নিলে মূল শহরে আরও কিছুক্ষণ ঘুরাঘুরি করলাম। এসময় ফুয়াদ আমাদের সঙ্গেই ছিলো। সেই আমাদেরকে শহরের পাশেই বয়ে চলা মহানন্দা নদীর পাড়ে নিয়ে গেলো। এখানে চা পানের পর আমরা কিছুক্ষণ হাঁটাহাঁটি ও ছবি তুলে নিলাম। তারপর ফুয়াদকে বিদায় জানিয়ে আমি আর এনামুল বিকেল সাড়ে ৩ টার দিকে বাসস্ট্যান্ডের উদ্দেশ্যে রওনা হই। সেখান থেকে আমাদের নতুন গন্তব্য হয় রাজশাহী জেলা। (চলবে…)
লেখক: জিল্লুর রহমান রিয়াদ, শিক্ষার্থী, ভূগোল ও পরিবেশ বিভাগ, জাহাঙ্গীরনগর বিশ্ববিদ্যালয়, সাভার, ঢাকা।

শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *




© ২০১৯ দৈনিক নবযুগ কর্তৃক সর্বস্বত্ব সংরক্ষিত
Designed and developed by Smk Ishtiak